বুকে ব্যথা বা শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করলে অনেকেই সেটিকে সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে করে অ্যান্টাসিড খেয়ে ঘরে বসে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে এই ভুল ধারণা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে হৃৎপেশি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা হার্ট ফেইলিউর বা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। প্রথম আলো এবং চমেক হৃদ্রোগ বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এবং অপসোনিন ফার্মার সায়েন্টিফিক পার্টনারশিপে এই আলোচনা সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চিকিৎসকরা জানান, চট্টগ্রামে হৃদ্রোগের চিকিৎসায় অবকাঠামো ও জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া রোগীদের দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানো, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা দূর করার কথা বলেন সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক। তিনি জানান, বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি, জ্বালাপোড়া এবং সেই ব্যথা হাত বা থুতনিতে ছড়িয়ে পড়া হার্ট অ্যাটাকের প্রধান লক্ষণ। এছাড়া অতিরিক্ত ঘাম ও বমি ভাবও এর সংকেত হতে পারে। তবে নারী, প্রবীণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে; যেমন—হাতে ঝিমঝিম করা, মাথা হালকা লাগা বা সামান্য অস্বস্তি।
দক্ষিণ এশীয় মানুষের শারীরিক গঠন এবং ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন সাবেক অধ্যাপক এ কে এম মনজুর মোরশেদ। তাঁর মতে, বিএমআই কম হলেও এই অঞ্চলের মানুষের পেটে অতিরিক্ত চর্বি, কম বয়সে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইডের কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। এর প্রতিকার হিসেবে নিয়মিত হাঁটার পরামর্শ দেন তিনি। সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম জানান, তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস থাকলেও অনেকে তা জানেন না। ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আসক্তি পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এছাড়া ধূমপান, অ্যালকোহল ও মাদকের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন সহযোগী অধ্যাপক মো. সালেহ উদ্দিন সিদ্দিকী।
চিকিৎসকরা তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন: প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুততম সময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সহযোগী অধ্যাপক আশীষ দে জানান, রক্তনালির ব্লক খুলতে 'প্রাইমারি পিসিআই' আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলেও যানজট ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে রোগীরা সময়মতো সেবা পান না।
চমেক-এর বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে সহযোগী অধ্যাপক এস এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, গত এক বছরে ২০ হাজার ৪৪৩ জন হৃদ্রোগী ভর্তি হয়েছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামের দুই কোটি মানুষের জন্য সিসিইউ শয্যার সংখ্যা মাত্র ১৯৮টি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র তিনজন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন জানান, চিকিৎসক ও নার্সের তীব্র সংকট রয়েছে এবং তিনটি ক্যাথল্যাবের একটি বর্তমানে অকেজো।
প্রতিরোধের উপায় হিসেবে চিনি, লবণ ও সাদা ভাতের পরিমাণ কমিয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার কথা বলেন অধ্যাপক প্রবীর কুমার দাশ। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে হৃদ্রোগের প্রাকৃতিক 'ভ্যাকসিন' হিসেবে অভিহিত করেন। সবশেষে, উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আনিসুল হোসেন আহ্বান জানান, হৃদ্রোগকে শুধু বিশেষায়িত বিষয় হিসেবে না দেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে এবং প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা ও চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে।




