পূর্ববর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়া গেছে। একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত ফরেনসিক অডিটের ফলে এই গরমিলগুলো সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি বর্তমানে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে এবং এটি খুব শীঘ্রই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ বা প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে কোনো কাজ করা মানে নিজের সঙ্গে প্রতারণা করা। তিনি তথ্যের গুরুত্ব উল্লেখ করে জানান, সরকারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সঠিক তথ্য। এই লক্ষ্যে বিবিএস-কে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হচ্ছে এবং সংস্থায় জনবলের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, অতীতের অনিয়মের গভীরে প্রবেশ করতেই ফরেনসিক অডিট করা হয়েছে, কাউকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য নয়। তাঁর মতে, তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত হবে, ভুল ও অসংগতিগুলো তত স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসবে, যা ভবিষ্যতে সংশোধনের পথ প্রশস্ত করবে। বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্যের প্রয়োজনীয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তাঁর বক্তব্যে বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময় পরিসংখ্যান ব্যবহার করে এক ধরনের কৃত্রিম বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি জানান, জিডিপি হিসাবের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্যেও ব্যাপক গরমিল ছিল, যার ফলে প্রকৃত হকদাররা সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, নৌযানের সংখ্যা আগে যেখানে ১৩ হাজার দেখানো হয়েছিল, প্রকৃত পর্যালোচনায় দেখা গেছে সেই সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার। এই ধরনের অসংগতি দূর করতে সরকার ডিজিটাল রেজিস্টার বিনিময়ের পদক্ষেপ নিচ্ছে। বর্তমানে তথ্যের মাধ্যমে এক ধরনের 'হাইব্রিড যুদ্ধ' চলছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান ছাড়া দেশের বর্তমান অবস্থান, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং ভুলত্রুটিগুলো বোঝা অসম্ভব। তাই পরিসংখ্যানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জিডিপি সংক্রান্ত প্রশ্নে ফরেনসিক অডিটে যথেষ্ট প্রমাণসহ গরমিল পাওয়া গেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এখন ভোক্তা মূল্যসূচকসহ (সিপিআই) বিভিন্ন তথ্য বিবিএস নিজেই প্রকাশ করছে, যা আগে মন্ত্রীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন হতো।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভাপতিত্ব করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার। এছাড়া বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক, পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন এবং বিআইডিএস-এর মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক আলোচনায় অংশ নেন। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রণীত তথ্য অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সঠিক নীতিনির্ধারণে এর ভূমিকা অপরিসীম।