রাজধানীর শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও এবং পশ্চিম শেওড়াপাড়ার মতো এলাকার বস্তি ও টিনের ঘরগুলোতে এখন পুনরায় দৃশ্যমান হচ্ছে মাটির চুলা। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের বাসিন্দারা এখন লাকড়ি, চেলা কাঠ এবং কাগজ পুড়িয়ে খাবার প্রস্তুত করছেন।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ২ হাজার ৬০ টাকা ঘোষণা করলেও খুচরা বাজারে তা ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত মার্চ মাসে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা এবং বাজারে তা গড়ে দেড় হাজার টাকায় পাওয়া যেত। সাড়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাওয়ায় তামান্নার মতো অনেক নারী এখন দ্রুত রান্নার সুবিধা ত্যাগ করে কষ্টসাধ্য লাকড়ির চুলার দিকে ঝুঁকছেন। তামান্না, যিনি স্বামীর সঙ্গে খাবারের দোকান চালান, জানান যে অনেকের পক্ষে এই বাড়তি দাম দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে সংসার চালাতে গিয়ে তারা বিকল্প উপায়ে রান্না করছেন। তবে লাকড়িতে রান্নার খরচও এখন কম নয়; প্রতি কেজি লাকড়ির দাম ১৫ টাকা এবং মণ প্রতি ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে আগারগাঁওয়ের বস্তিতে। রহিমা নামের এক গৃহকর্মী জানান, অসুস্থতা ও বয়সের কারণে তাঁর আয় সীমিত। পাঁচ সদস্যের পরিবারে মাসে দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করলে খরচ দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা, যা তাঁর সামর্থ্যের বাইরে। লাকড়ির চুলায় রান্নার কারণে কাপড় ও ঘরের দেয়ালে কালি লেপটে যাচ্ছে এবং ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টের মতো স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ভোলায় নদী ভাঙনের পর ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নেওয়া রহিমার মতো অসংখ্য মানুষ এখন এই সংকটে ভুগছেন।

অন্যদিকে, পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকার এখন নতুন করে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দিচ্ছে না। তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংযোগ থাকলে মাসিক বিল ১ হাজার ৮০ টাকার আশেপাশে থাকে, কিন্তু সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য এই খরচ বহুগুণ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একজন গৃহকর্মীর পুরো মাসের আয় একটি সিলিন্ডারের দামের সমান, যার ফলে তাঁদের পক্ষে একবারেই আড়াই হাজার টাকা জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে লাকড়ির বাজারেও। আগারগাঁওয়ের লাকড়ি বিক্রেতা হাফিজুর জানান, আগে যেখানে দিনে এক থেকে দেড় মণ লাকড়ি বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে ৭ থেকে ১০ মণে দাঁড়িয়েছে। মানভেদে প্রতি মণে লাকড়ির দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টার মতে, এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে, তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তা এখন এক চরম জীবনসংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।