জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন। 'ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরতে' এনসিপির পলিসি ও রিসার্চ–বিষয়ক উপকমিটি এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে 'বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন-অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা' শীর্ষক একটি পুস্তিকা পড়ে শোনানো হয়। পুস্তিকায় সরকারের প্রথম ছয় মাসের নানা সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকার ১৮০ দিনের জন্য তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছিল—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয়, ছয় মাস পর দেখা গেছে তিনটি অগ্রাধিকারের প্রতিটিতেই সরকার নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের নজিরবিহীন সংকট শিল্প উৎপাদন, কৃষি খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছে। জ্বালানিসংকটে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং শ্রমিকেরা চাকরি হারাচ্ছেন, কৃষকদের উচ্চ মূল্যে সার কিনতে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, ব্যাংকিং খাতের লুটেরারা ফিরে আসছে এবং ভোগ্যপণ্য ও আমদানি বাজারে পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে—বিএনপি তাতে নতুন অংশীদার হিসেবে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সংস্কার, যেমন মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ আইন ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়—একটি একটি করে বাতিল করা হচ্ছে। এসবের জায়গায় আগের চেয়ে দুর্বল ও অকার্যকর আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বহুল প্রচারিত ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারকে ছুড়ে ফেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্লজ্জ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তার।
জুলাই গণহত্যার বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার নির্ধারিত অগ্রাধিকার নীতিতে বিচার ও শহীদ পরিবার-আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন অনুপস্থিত। বিরোধী দল, মত ও সাংবাদিকদের ওপর সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের হামলা-মামলার ঘটনা অব্যাহতভাবে বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং সিংহভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের পরিবর্তে আহত ব্যক্তিদের আইনিভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। পুলিশকে আবার দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও জুলাই সনদ ভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ তার।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, 'প্রথম ১৮০ দিনে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে তারেক রহমানের কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেই দেশকে পরিচালনা করার। শুধু ক্ষমতায় বসেছেন এবং পুরোনো পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফ্যাসিস্টদের পরিকল্পনা ও নীতি অনুযায়ী তিনি দেশকে পরিচালনা করছেন, দেশকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছেন।' সরকার সার্বিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য, বিশেষ করে এনসিপি গত ছয় মাসে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি করেন তিনি। নাহিদ ইসলাম বলেন, 'আমরা মনে করি, আমরা খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করেছি বিরোধী দলের জায়গা থেকে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন আনার কথা, সেটা বিরোধী দল এনেছে। সরকার সেটার জবাব দিয়েছে আমাদের একজন ভাইয়ের চোখ কেড়ে নিয়ে। গাইবান্ধায় একজন মারা গিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গায় হামলা হচ্ছে।' বিরোধী দল আসলে ব্যর্থ, বিরোধী দল দুর্বল—এমন প্রচারকে 'সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার প্রোপাগান্ডা' হিসেবে দেখেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম জানান, শিগগিরই ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চ হবে পাঁচ থেকে ছয়টি বিভাগে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে। সেই মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে তারা সরকারকে একটি বড় বার্তা দেবেন। এরপর আরও কঠোর আন্দোলনের প্রয়োজন হলে তার ঘোষণা দেওয়া হবে। পাশাপাশি এনসিপিও তার সক্ষমতা অনুযায়ী উপজেলা-জেলা পর্যায়ে ও মহানগরগুলোয় কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে।
ভারত প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সেটি ভারত সরকারের সহযোগিতা বা মদদ ছাড়া সম্ভব ছিল না। আওয়ামী লীগকে কার্যক্রম করতে দেওয়া, আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন রাখা—এটা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। এটি সাংঘর্ষিক ও দ্বিচারিতা বলে মন্তব্য করেন তিনি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না দেওয়া, শেখ হাসিনাকে সেখানে না রাখা, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারত সরকার শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং ওসমান হাদির খুনিদের ফেরত দেওয়া—এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা পেলেই বিগত ১৫ বছরে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুনভাবে পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বছর গঙ্গা চুক্তি শেষ হচ্ছে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ যাতে পানির ন্যায্য হিস্যা পায়, সীমান্তে পুশ–ইন যাতে না হয়, সীমান্ত হত্যা যাতে বন্ধ হয়—ইত্যাদির ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব। শেখ হাসিনা যে দিল্লিতে রয়েছেন, সেখানে যদি আবার তারেক রহমান যান, তাহলে এটার অর্থ কী দাঁড়াবে—প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের জনগণ বা বিশ্ববাসী কীভাবে দেখবে? আমরা মনে করি, এটা শুধু তারেক রহমানের বিষয় নয়, বাংলাদেশের জন্য এটা একটা অবমাননাকর ঘটনা হবে। বাংলাদেশ যে স্বাধীনভাবে পররাষ্ট্রনীতি বা সার্বভৌমত্বের জায়গায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না—এটাই বার্তা যাবে।' এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সালেহউদ্দিন সিফাত অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।




