দেশের বিদ্যমান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে বড় ধরনের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০০৯ সালে প্রণীত এই আইনের পরিধি বাড়িয়ে এখন শুধু মানুষের নয়, বরং গবাদিপশু, মৎস্যসহ সকল প্রাণীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতিপূর্বে এই ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে, যার ওপর আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে। গত ১০ সেপ্টেম্বরের এক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর এই খসড়া প্রস্তুত করা হয়।
এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণা। এই দর্শনে মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে আলাদা করে না দেখে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, মানুষের পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনটিকে হালনাগাদ করা হচ্ছে। জনমত সংগ্রহের পর চূড়ান্ত খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পেশ করা হবে।
নতুন খসড়ায় ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্সের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা ২০০৯ সালের আইনে অনুপস্থিত ছিল। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত পেমেন্ট গেটওয়ে এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত কুরিয়ার সার্ভিসের সংজ্ঞা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়া বা বেটিংয়ের আয়োজন করা এবং এতে সহায়তা করার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সরকারি অনুমোদন বা নিবন্ধন ছাড়া কোনো পণ্য, ওষুধ কিংবা সেবা প্রস্তুত ও সরবরাহ করা এবং সেই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা বা অসত্য তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে ক্রেতাকে রসিদ প্রদান বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রসিদ না দিলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হতে পারে। এছাড়া নির্ধারিত মান বজায় না রাখলে বিক্রেতার সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে বর্তমান আইনের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের মেয়াদ কমিয়ে দুই বছর করার প্রস্তাব থাকলেও, জরিমানার পরিমাণ দুই লাখ থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ার সহজীকরণে আপিল ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমানে হাইকোর্টে আপিল করার ৯০ দিনের সময়সীমা কমিয়ে ৬০ দিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং আপিল আদালত হিসেবে হাইকোর্টের বদলে সংশ্লিষ্ট জেলা জজ আদালতকে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। মামলার শুনানির জন্য মহানগরে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং এর বাইরে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার একই অপরাধ করলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পর ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, গত ১৭ বছরে ভোক্তা অধিকারের পরিধি ও প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়েছে, তাই আইনটি যুগোপযোগী করা জরুরি। তিনি ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের বিষয়টি আইনে আনার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।




