ভারতের ওডিশা উপকূলের নিকটবর্তী বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এমভি ওশান উইনার’ ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাংলাদেশের নাগরিক ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার উত্তর কাটিয়া এলাকায় তাঁর তিনতলা বাড়িতে এখন শোকের ছায়া। সোমবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সিঁড়ির পাশে সারি করে রাখা জুতা, দরজা খুলতেই কান্নার শব্দ। একটি কক্ষের বিছানায় বসে আছেন নিখোঁজ ব্যক্তির বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকী; তাঁর কোলে চুপচাপ বসে আছে মামুনের চার বছরের ছেলে মুয়াজ ও আট বছরের মেয়ে জান্নাত। বাকীর মুঠোফোন বারবার বেজে উঠছে—প্রতিবারই স্বজনেরা ছুটে আসছেন, হয়তো কোনো খবর এসেছে; কিন্তু প্রতিবারই ফিরতে হচ্ছে হতাশ হয়ে।

মামুন ডিপ্লোমা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গত এপ্রিলের শেষ দিকে ওই জাহাজে যোগ দেন। ‘ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার’ পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। জাহাজটি গত শুক্রবার ওডিশা থেকে আকরিক লোহা নিয়ে সিঙ্গাপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে। এর আগে গত বুধবার হোয়াটসঅ্যাপে মামুনের সঙ্গে তাঁর বড় ভাইয়ের সর্বশেষ কথা হয়। বৃহস্পতিবার মামুনের স্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয়েছিল তাঁর। এরপরই জাহাজডুবির খবর পৌঁছায় পরিবারে। বাকী মুঠোফোনে দেখালেন, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হওয়া শেষ কথোপকথনের ছবি এবং জাহাজ থেকে পাঠানো কয়েকটি ভিডিও—কোথাও সমুদ্রের বুকে জাহাজ চলছে, কোথাও জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন মামুন। এই ভিডিও ও বার্তাগুলোই এখন পরিবারের কাছে তাঁর শেষ দৃশ্যমান স্মৃতি।

বড় ভাই বাকী বলেন, বারবার মানুষ ফোন করে জানতে চাইছেন মামুনের কোনো খোঁজ মিলেছে কি না; কিন্তু তাঁরা এখনো কিছুই জানেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট দুই সন্তানের বয়স এত কম যে তারা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না কী ঘটেছে; তবু নানা শঙ্কায় পরিবারের মন মানছে না। অন্যদিকে মেজ ভাই আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাড়ির অন্য একটি ঘরে বসে কাঁদছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে জানান, তাঁরা শুধু শুনেছেন জাহাজটি ডুবে গেছে; এরপর থেকে ভাইয়ের আর কোনো সন্ধান মেলেনি। বৃদ্ধ মা-বাবা, মামুনের স্ত্রী—কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারছেন না তিনি। একটু থেমে আবার বলেন, দুজন উদ্ধার হওয়ার খবর পেয়েছেন; কিন্তু ভাইসহ বাকিদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই। তাঁরা সরকারের কাছে সঠিক তথ্য চান এবং আশা করেন, মামুন সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসবেন। বৃদ্ধ চাচা আতিয়ার রহমানও বাড়িতে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলেটি বেঁচে আছে কি না, কী অবস্থায় আছে—একটু যদি জানতে পারতেন, তাহলে অন্তত মনকে বুঝ দেওয়া যেত।

পরিবারের পক্ষ থেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে; তবে সেখান থেকেও মামুন সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান বাকী। তিনি আরও জানান, জাহাজডুবির পর সত্তরের বেশি ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। সাগর উত্তাল থাকায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হচ্ছে বলেও তাঁরা জেনেছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাঁদের অনুরোধ—ভারত সরকারের সঙ্গে, বিশেষ করে ভারতের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার তৎপরতা আরও দ্রুত ও কার্যকর করা হোক। তাঁরা যত দ্রুত সম্ভব মামুনের খোঁজ চান।

ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, জাহাজটিতে মোট ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন চীনের, তিনজন মিয়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক। জাহাজডুবির পর এখন পর্যন্ত দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি নাবিকদের সন্ধানে ভারতের কোস্টগার্ডের তিনটি জাহাজ তল্লাশি চালাচ্ছে। পাশাপাশি ভারতের নৌবাহিনীর দূরপাল্লার সামুদ্রিক টহল বিমান ও জাহাজও অনুসন্ধানে যুক্ত রয়েছে। জীবিত উদ্ধার হওয়া দুই চীনা নাবিকের বরাতে জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, জাহাজটি হঠাৎ এক পাশে কাত হয়ে যায় এবং প্রায় আট মিনিটের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যায়। দ্রুত ডুবে যাওয়ায় সব নাবিকের নিরাপদে জীবনরক্ষাকারী ভেলায় ওঠার সুযোগ হয়নি।

তবু উত্তর কাটিয়ার বাড়িটিতে এসব তথ্যেও স্বস্তি ফিরছে না। মুঠোফোনের পর্দায় থাকা ভিডিও, শেষ কথোপকথন ও পুরোনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন স্বজনেরা। পাশে বসে আছে মামুনের দুই সন্তান। তাঁদের একটাই অপেক্ষা—কোনো খবর আসুক, তিনি যেন জীবিত ফিরে আসেন। বাংলাদেশি এই মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের খোঁজ না মেলায় উৎকণ্ঠা বাড়ছেই; পরিবার ও স্বজনদের দাবি, আন্তর্জাতিক সমন্বয়ে উদ্ধার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হোক।