প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে সরকারি নীতিমালার পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন অ্যান্ড্রু কুয়োমো। তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতোই আর্থিক খাতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এখন নীতি-নির্ধারকদের সামনে এমন সব প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা বলে মনে হতো।

কুয়োমোর মতে, ইলেকট্রনিক ট্রেডিং, অটোমেটেড মর্টগেজ আন্ডাররাইটিং বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো প্রযুক্তিগুলো একসময় এই খাতের রূপান্তর ঘটিয়েছিল এবং সে সময়কার নিয়ন্ত্রকদের পুরনো নিয়মগুলো পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছিল। বর্তমানে ডিজিটাল সম্পদ এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই প্রযুক্তি আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সহজলভ্য করার সম্ভাবনা রাখে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে একটি সামগ্রিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিতে অত্যন্ত ধীরগতি প্রদর্শন করছে, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

২০০৯ সালে বিটকয়েনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল সম্পদ যুগে উদ্ভাবন এবং নিয়মের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কুয়োমো উল্লেখ করেন যে, তিনি নিউইয়র্কের গভর্নর থাকাকালীন ২০১১ সালে ডিপার্টমেন্ট অফ ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ২০১৪ সালে 'বিটলাইসেন্স' প্রস্তাব করেছিলেন, যা ছিল ভার্চুয়াল কারেন্সি ব্যবসার জন্য দেশের অন্যতম প্রথম নিয়ন্ত্রক কাঠামো। তার মূল দর্শন ছিল—উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে, তবে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। বর্তমানে তিনি গ্লোবাল ফিনানশিয়াল-টেক কোম্পানি OKX-এর বোর্ডে রয়েছেন এবং নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের মূল প্রতিষ্ঠান ইন্টারকন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জের সাথে তাদের একটি যৌথ উদ্যোগের সহ-চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে তারা টোকেনাইজড ইক্যুইটি এবং ব্লকচেইন-নির্ভর আর্থিক পণ্য তৈরির কাজ করছেন।

টোকেনাইজেশনকে তিনি আগামীর নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন, যা প্রথাগত আর্থিক অবকাঠামোকে ডিজিটাল ব্লচেইনে রূপান্তর করে মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমাবে এবং ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আর্থিক পণ্যগুলোকে আরও সহজলভ্য করবে। যদিও সম্প্রতি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC) 'ইনোভেশন এক্সেম্পশন' চালুর মাধ্যমে টোকেনাইজড মার্কিন শেয়ারের সীমিত ট্রেডিংয়ের অনুমতি দিয়েছে, তবে কুয়োমো মনে করেন এটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। তার মতে, ডিজিটাল অ্যাসেট মার্কেট ক্লারিটি অ্যাক্টের মতো প্রয়োজনীয় আইনগুলো সিনেটে পাস না হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো একটি স্থায়ী সংবিধিবদ্ধ কাঠামোর অভাব রয়েছে।

তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'মার্কেটস ইন ক্রিপ্টো-অ্যাসেটস' (MiCA) রেগুলেশনের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইউরোপ ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে একটি সাধারণ কাঠামো তৈরি করে ব্যবসায়িক পূর্বাভাস এবং নিশ্চয়তা প্রদান করতে পেরেছে। বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষের মধ্যে এখনো একমত হওয়া সম্ভব হয়নি। এই অনিশ্চয়তার ফলে বিনিয়োগকারী এবং কোম্পানিগুলো যেখানে বেশি নিশ্চয়তা পাবে, সেখানেই বিনিয়োগ করবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

পরিশেষে, অ্যান্ড্রু কুয়োমো সতর্ক করে বলেন যে, ওয়াল স্ট্রিট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। যদি দ্রুত এবং স্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্মের আর্থিক অবকাঠামো অন্য দেশে গড়ে উঠবে। প্রযুক্তির সাথে নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় ঘটিয়ে নেতৃত্ব ধরে রাখাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।