সম্প্রতি ডেভিড এলিসন প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্সের কো-সিইও হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ম্যাটেলের বর্তমান প্রধান ইনন ক্রেইজকে। তার মূল দায়িত্ব হবে কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং ওয়ার্নার ব্রোস ডিসকভারির ১১০ বিলিয়ন ডলারের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া তদারকি করা। বার্বি, হট হুইলস এবং ফিশার-প্রাইসের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পেছনে থাকা এই ব্যক্তিকে বিশ্বের অন্যতম বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনাটা অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও, তার পুরো ক্যারিয়ারটিই ছিল ঝুঁকি নেওয়ার গল্প।
ক্রেইজের এই সাহসী দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য উদাহরণ তিনি নিজেই শেয়ার করেছেন। ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়ার হোয়ারটন স্কুল অফ বিজনেস-এর একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি জানান, তিনি প্রায়ই স্থানীয় একটি ক্যাফেতে বসে কাজ করেন। সেখানে এক বারিস্টার দক্ষতা ও গ্রাহকসেবার আন্তরিকতা তার নজর কাড়ে। কথা বলে তিনি জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি একজন ইরানি শরণার্থী, যিনি ২১ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে তুরস্কের ক্যাম্পে তিন বছর কাটিয়ে একাকী যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি থাকলেও তার জীবনসংগ্রামে অভিজ্ঞতার অভাব ছিল, তাই তিনি বারিস্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। তার রেজ্যুমেতে তেমন কিছু না থাকলেও, প্রতিকূল পরিবেশ জয় করার সাহস এবং দৃঢ় সংকল্প দেখে ক্রেইজ তাকে ম্যাটেলের ইন্টার্ন হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি ম্যাটেলের গ্লোবাল টেকনোলজি টিমের একজন উচ্চপদস্থ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এই অভিজ্ঞতার আলোকে ক্রেইজ বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের পরামর্শ দেন যে, ডিজিটাল যুগের জুম কল বা এআই-এর ভিড়ে মানুষের সাথে সরাসরি সংযোগ এবং সাধারণ কথোপকথনের গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি বলেন, "চোখ মেলুন এবং মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন; মানবিক সম্পর্কই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।"
ইসরায়েলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ক্রেইজের লক্ষ্য ছিল মার্কিন ব্যবসায়িক জগতে ক্যারিয়ার গড়া। বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও ম্যানেজমেন্টে স্নাতক ও ইউসিএলএ থেকে এমবিএ শেষ করার পর তিনি মিডিয়া মোগল হাইম সাবানের সাথে পরিচিত হন। তাদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত 'ফক্স কিডস ইউরোপ' ২০০২ সালে ডিজনির কাছে বিক্রি হয়। এরপর তিনি এন্ডেমোল এবং মেকার স্টুডিওর নেতৃত্বে কাজ করেন। বিশেষ করে মেকার স্টুডিওসকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য থেকে উদ্ধার করে তিনি ৫০০ মিলিয়ন ডলারে ডিজনির কাছে বিক্রি করে দেন। ২০১৮ সালে তিনি ম্যাটেলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ম্যাটেলকে কেবল একটি খেলনা প্রস্তুতকারক কোম্পানি থেকে বিনোদন ও ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি কোম্পানিতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা করেন তিনি। এই যাত্রায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল 'বার্বি' সিনেমাটি তৈরি করা। সিনেমার স্ক্রিপ্টে ম্যাটেল কোম্পানি এবং ক্রেইজ নিজেই নেতিবাচকভাবে চিত্রিত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রচলিত হলিউড ফর্মুলার বাইরে গিয়ে পরিচালক গ্রেটা গারউইগ এবং তারকা মার্গো রিবির ওপর আস্থা রাখেন। ফলাফল হিসেবে সিনেমাটি ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রে পরিণত হয় এবং ম্যাটেলের বার্বি পুতুলের বিক্রি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। প্রথা ভেঙে নতুন কিছু করার এই সাহসই তাকে আজ প্যারামাউন্ট এবং ওয়ার্নার ব্রোস-এর মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।




