দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা ১ হাজার হলেও প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী সেখানে ভর্তি থাকেন, যা ধারণক্ষমতার আড়াই গুণ বেশি। ফলে শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের পুরোনো ভবনের বারান্দার মেঝে, ওয়ার্ডের চলাচলের পথ এবং বিভিন্ন করিডোরে বিছানা পেতে দিন কাটাচ্ছেন রোগীরা। বরগুনা থেকে আসা ৭০ বছর বয়সী আবদুস সালাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত বেলাল হোসেনের মতো অসংখ্য রোগী শয্যার অভাবে মেঝেতে ঠাঁই নিয়েছেন। পাশাপাশি হাসপাতালের শৌচাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে রোগীদের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
হাসপাতালের জনবলকাঠামো গত কয়েক দশকের তুলনায় বাড়েনি। বর্তমানে ১ হাজার শয্যার এই প্রতিষ্ঠানটি পুরোনো ৫০০ শয্যার জনবলকাঠামো দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসক পদের হার ২৯.১০ শতাংশ শূন্য, যেখানে ৩২৩টি পদের বিপরীতে মাত্র ২২৯ জন কর্মরত। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির প্রায় ৪৭ শতাংশ পদ খালি এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদেও বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। এই সংকট সামাল দিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২২২ জন কর্মী নিয়োগ দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার রোগীর বিপরীতে মাত্র ৫৩ জন চিকিৎসক রয়েছেন, যার ফলে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে ৭৫ জন রোগী দেখতে হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসক দুর্গা প্রসাদ সরকারের মতে, বেলা তিনটা থেকে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত হাসপাতালের প্রধান ভরসা কেবল ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিশেষায়িত সেবার অভাব এখানে প্রকট। গুরুতর রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (সিসিএম) ইউনিট নেই এবং হৃদ্রোগীদের জন্য ক্যাথল্যাব না থাকায় এনজিওগ্রামের মতো পরীক্ষার জন্য রোগীদের বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হয়। এছাড়া রোগী পরিবহনের জন্য ট্রলির তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৩টি ট্রলি থাকলেও প্রয়োজন ৫০টির। ট্রলিম্যান না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদেরই ট্রলি ঠেলতে হয়। এমনকি স্ট্রোক করা এক রোগীকে ট্রলি না পেয়ে তিনতলায় কোলে করে নিয়ে যাওয়ার মতো করুণ ঘটনাও ঘটেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট হাসপাতালের নতুন পাঁচতলা ভবনের সেবাকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় লিফট, ফ্যান ও লাইট অকেজো হয়ে পড়ে। জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর নিয়মিত চালানো সম্ভব হয় না, ফলে প্রতিদিন ২০-২৫টি অস্ত্রোপচারের কথা থাকলেও তা কমে ১০-১২টিতে নেমে আসে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর জানিয়েছেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।




