দীর্ঘ পাঁচ বছর পথশিশুদের সাথে কাটানোর পর পরিবারের কাছে ফিরে আসা কিশোর সাইদুলের জীবনে আবারও ফিরে এল বিচ্ছেদের বেদনা। ২০২১ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে ভুল ট্রেনে চড়ে ঢাকায় হারিয়ে যাওয়া সাইদুল চলতি বছরের এপ্রিলে প্রথম আলোর সংবাদের মাধ্যমে পরিবারের সাথে পুনরায় মিলিত হয়েছিল। তবে চেনা ঘরের মায়ায় সে খুব বেশিদিন স্থির থাকতে পারেনি। বাড়ি ফেরার মাত্র পাঁচ মাস পর ছোট বোনের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি এবং মায়ের বকুনিতে ভীষণ অভিমান করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর আবারও ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় সে। ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম থেকে সে পুনরায় ফিরে যায় ঢাকার সেই পরিচিত ফুটপাতে।
সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার পর তার মা ফাতেমা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সংবাদ প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করেন। ফাতেমা জানান, ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ছোট বোনের সাথে ঝগড়া হওয়ায় তিনি ছেলেকে বকাঝকা করেছিলেন। পরদিন সকালে খাবার বেড়ে রেখে কাজে গিয়ে দুপুরে ফিরে দেখেন সাইদুল নিখোঁজ। ছোটবেলা থেকেই সাইদুলের রাগ ও অভিমান বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকার বিজয়নগরের সড়ক বিভাজকে পথশিশুদের সাথে সময় কাটানোর অভ্যাস থাকায় প্রতিবেদক সেখান থেকেই খোঁজ শুরু করেন। সাইদুলের পুরোনো বন্ধুদের মাধ্যমে তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। একটি গাছের নিচে বসে থাকা সাইদুলকে দেখলেও তাকে জোর করে ধরার চেষ্টা করা হয়নি, যাতে সে ভয় পেয়ে আরও দূরে পালিয়ে না যায়। পরিবর্তে তার বন্ধু শুভর মাধ্যমে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। একইসাথে 'পথের ইশকুল' নামক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক উম্মে সালমা আক্তারকে একটি চিরকুট পাঠিয়ে সাইদুলের কাউন্সেলিং করার অনুরোধ জানানো হয়। সালমা আক্তার ফোনে ফাতেমা আক্তারকে শান্ত করেন এবং সাইদুল স্কুলে এলে তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে বাড়ি পাঠানোর আশ্বাস দেন।
বিজয়নগরের একটি পানের দোকানদারের মুঠোফোন ব্যবহার করে সাইদুল তার মায়ের সাথে কথা বলে। প্রথমে সাত-আট দিনের মধ্যে ফেরার কথা বললেও পরবর্তীতে সে আকুল হয়ে বলে, 'মা, আমারে নিয়্যা যাও।' তবে ফাতেমা আক্তার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় না আসার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তিনি চেয়েছিলেন সাইদুল যেন নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসে। এছাড়া আর্থিক অনটন এবং নতুন চাকরিতে ছুটির সমস্যার কারণেও তিনি দেরি করেন। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, তাড়াহুড়া করলে সাইদুল আবার ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত মায়ের অপেক্ষার প্রয়োজন হয়নি। ৭ অক্টোবর বুধবার মধ্যরাতে ১১ দিন পর সাইদুল একাই বাড়ি পৌঁছায়। বাড়ি ফেরার পর থেকেই সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ছেলের ফিরে আসায় বাবা মোস্তফা কামাল আনন্দিত হলেও তার শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে চিন্তিত। তবে মা ফাতেমার মতে, দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটানোর ফলে সাইদুলের মন থেকে পথের টান এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি; সে মাঝে মাঝেই আনমনা হয়ে বলে যে তার আবারও ঢাকা যাওয়া দরকার কারণ অনেক বন্ধুকে সে বলে আসতে পারেনি।




