দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সচল করতে বড় ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, যেসব ঋণগ্রহীতার খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি, তারা ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধের জন্য মোট ১৫ বছর সময় পাবেন। এই সুবিধার আওতায় প্রথম দুই বছর কোনো কিস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হবে না, যা মূলত গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, এক হাজার কোটি টাকার কম ঋণখেলাপিদের জন্য তুলনামূলক সীমিত সুযোগ রাখা হয়েছে। আগ্রহী ঋণগ্রহীতাদের চলতি মাসের মধ্যেই আবেদন করতে হবে এবং ব্যাংকগুলোকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্তের পেছনে জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, যা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর ফলে ঋণের সুদ ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক মন্দাও বড় প্রভাব ফেলেছে। উল্লেখ্য, সিটি গ্রুপ এবং জিপিএইচ ইস্পাতের মতো কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এই বিশেষ সুবিধার জন্য আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং তাদের আবেদন পর্যালোচনার পর এই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক আরও এক পদক্ষেপ হিসেবে ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই তহবিলের ঋণ বিতরণ শুরু করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাস। তবে অনেক ব্যবসায়ী খেলাপি হওয়ার কারণে এই প্রণোদনা ঋণ পেতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন, যাদের জন্য পুনঃতফসিলের এই সুযোগ কার্যকর হবে।
ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গত মার্চ মাসের শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট বিতরণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, যার ৩২.২৬ শতাংশ অর্থাৎ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে পড়েছে। গত তিন মাসেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ব্যাংকারদের মতে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির প্রভাবেই এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা এবং হল-মার্কের মতো বড় গ্রুপগুলোর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের এই পাহাড় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশের বেশি।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্যোগের বিষয়ে মত দিয়ে জানান, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ প্রয়োজন। আগে যেখানে লুটপাটের সুযোগ দেওয়া হতো, এখন পরিস্থিতিগত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অর্থ পাচারকারী এবং লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সুশাসনের মাধ্যমে এই নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে, এবিবি-র সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান একে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বললেও পরামর্শ দিয়েছেন যেন এই সুবিধা গণহারে না দিয়ে কেবল পরীক্ষিত এবং যোগ্য ব্যবসায়ীদের প্রদান করা হয়।




