বর্তমানে সমাজে সম্পদের চরম বৈষম্য বিরাজ করছে, যা অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সংকট মোকাবিলায় করপোরেট মালিকানার প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন একটি মডেল গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে, প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় শ্রমিকদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’ অনুষ্ঠানে এই মত প্রকাশ করা হয়। বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন ও সাজেদা ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই দিনব্যাপী সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।

সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, কেবল লোকদেখানো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রম দিয়ে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি প্রস্তাব করেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানার একটি নির্দিষ্ট অংশ এমন একটি ফাউন্ডেশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হোক, যা জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য স্থায়ী অর্থের উৎস হিসেবে কাজ করবে। অধ্যাপক সোবহানের মতে, রাজনৈতিক ও একাডেমিক পর্যায়ে যতক্ষণ না সম্পদের এই অধিকার সম্প্রসারণের গুরুত্ব স্বীকৃত হবে, ততক্ষণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যা একটি অসম পৃথিবীর জন্ম দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৌশিক বসু বলেন, বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী এবং বিশ্ব এক চরম সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এর ফলে প্রচলিত শ্রমের চাহিদা কমে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি। যেহেতু বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রমনির্ভর আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই এই সংকট উত্তরণে নৈতিক চিন্তা, গবেষণা এবং সামাজিক উদ্যোগের সক্রিয় আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সম্মেলনের অন্য একটি পর্বে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন ভিডিও বার্তার মাধ্যমে রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালসের ৫১ শতাংশ শেয়ার সাজেদা ফাউন্ডেশনকে দান করার বিষয়টিকে একটি নজিরবিহীন ও প্রশংসনীয় সামাজিক দায়িত্ববোধ হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং সৈয়দ হুমায়ুন কবীরের দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্নের কথা স্মরণ করেন।

অনুষ্ঠানের পরবর্তী আলোচনায় মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন প্রান্তিক মানুষের অধিকার সচেতনতা তৈরির গুরুত্ব এবং মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। আইসিডিডিআরবি-র ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনের উদাহরণ দিয়ে জানান, উদ্ভাবনের পাশাপাশি তা মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ফারুক সোবহান, রেনাটার সিইও সৈয়দ এস কায়সার কবির এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ চৌধুরী এবং সূচনা বক্তব্য দেন সাজেদা আমিন।