সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় আকারের বাণিজ্যিক বা আবাসিক সম্পদে ক্ষুদ্র অংকের বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয় রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REIT)। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারের মতো লভ্যাংশ আয় করতে পারেন। বর্তমানে বাংলাদেশে আবাসন খাতের অর্থায়ন সংকট এবং সাধারণ মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই পাওয়া কঠিন হয়ে পড়া পরিস্থিতিতে আরইআইটি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারত। যদিও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর জন্য বিশেষ বিধিমালা অনুমোদন করেছে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুতর প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে।

প্রথমত, মূলধনের শর্ত অত্যন্ত কঠোর। বিধিমালা অনুযায়ী, একটি আরইআইটি ফান্ড গড়তে ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা প্রয়োজন, আর সিটি কর্পোরেশন এলাকার জন্য এই অঙ্ক ৩০০ কোটি টাকা। এছাড়া ফান্ড ম্যানেজারের জন্য ২০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাধ্যতামূলক, যা স্থানীয় স্পনসর ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, প্রপার্টি হস্তান্তরের সময় ১০ থেকে ১২ শতাংশ উচ্চ স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়, যা বিনিয়োগের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া দ্বৈত করের ঝুঁকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

আর্থিক রিটার্নের দিক থেকেও এই খাতটি বর্তমানে আকর্ষণীয় নয়। বাংলাদেশে প্রপার্টির গড় ভাড়ার হার ৩ থেকে ৪.৫ শতাংশ, যেখানে ব্যাংক আমানত বা ট্রেজারি বন্ডে ৯ থেকে ১২ শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায়। এছাড়া জমির মালিকানা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা, মিউটেশন সমস্যা এবং স্বচ্ছ ভ্যালুয়েশন প্রতিষ্ঠানের অভাব এই প্রক্রিয়াকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে। পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন এই আর্থিক পণ্য আনতে ঝুঁকি দেখছেন। পাশাপাশি এনবিআর, রাজউক এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বিত কোনো বিশেষ করছাড় বা নীতিমালার অভাব রয়েছে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে আরইআইটি-কে সফল করতে কিছু বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো লভ্যাংশের ওপর সম্পূর্ণ বা আংশিক কর অব্যাহতি প্রদান, যাতে প্রকৃত রিটার্ন ব্যাংক সুদের সাথে পাল্লা দিতে পারে। এছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তরের রেজিস্ট্রেশন ফি কমিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেবল আবাসিক ফ্ল্যাটের বদলে লজিস্টিক হাব, ডেটা সেন্টার বা ওয়্যারহাউসিংয়ের মতো উচ্চ ভাড়ার বাণিজ্যিক স্পেস অন্তর্ভুক্ত করে একটি মিশ্র ফান্ড মডেল তৈরি করা যেতে পারে। পাশাপাশি জমির মূল্যবৃদ্ধির সুফলকে শেয়ার মূল্যে প্রতিফলিত করা এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ দিলে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ বাড়বে। এছাড়া টোল রোড বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের মতো অবকাঠামোর সাথে হাইব্রিড মডেল তৈরি করে গড় রিটার্ন ৯ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।

সফলভাবে আরইআইটি চালু হলে বাংলাদেশে আবাসন খাতে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে সাধারণ মানুষ রিয়েল এস্টেট খাতের অংশীদার হতে পারবে। ডেভেলপাররা ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে সরাসরি জনসাধারণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবেন। সর্বোপরি, এই ব্যবস্থা প্রপার্টি ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব এবং আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। তবে এটি বাস্তবায়নে বিএসইসি, এনবিআর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ ও সরকারি নীতিগত ছাড় অপরিহার্য।