দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পুনরায় ৬ লাখ কোটি টাকার গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ খেলাপি হিসেবে গণ্য, যার অর্থ প্রতি ১০০ টাকার ঋণের বিপরীতে প্রায় ৩২ টাকা ৭৮ পয়সা এখন অনাদায়ী। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছে না এবং এতে আমানতকারীদের সঞ্চয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের জালিয়াতি, বেনামি ঋণ এবং অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করায় এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, এই ঋণ হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং পুনঃতফসিল ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে যা এতদিন আড়ালে রাখা হয়েছিল, সম্পদ মান পর্যালোচনার ফলে তা এখন প্রকাশ পাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। এর আগে ডিসেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) একলাফে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, নিয়মিত সুদের সংযোজন এবং পুরনো অনাদায়ী ঋণ হিসাবভুক্ত হওয়ার কারণে এই বৃদ্ধি। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, পুনঃতফসিল সুযোগের ফলে ভবিষ্যতে এই হার কমবে।
তবে অনেক ব্যাংকার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া লাখ কোটি টাকার ভুয়া ও বেনামি ঋণই এই সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ; যেখানে মোট ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি খেলাপি। এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে চারটি ব্যাংক এস আলম গ্রুপের এবং একটি নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল, যাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। এছাড়া বেসিক, জনতা, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫০ শতাংশের বেশি।
শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ১১টিই এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন। এছাড়া সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো, আবদুল খালেক পাঠানের কেয়া কসমেটিকস, গোলাম মোস্তফার দেশবন্ধু সুগার মিলস এবং সিকদার গ্রুপের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নাম রয়েছে এই তালিকায়। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের সিটিসেল এবং আসলামুল হকের সিএলসি পাওয়ার কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও খেলাপি ঋণের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ জোট সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের জুনে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হয় এবং তারল্যসংকট তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফের সুযোগ দিলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কেবল কাগজে-কলমে ঋণ কমালে ব্যাংক খাতের মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন জানান, জ্বালানি সংকট ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা চাপে পড়েছেন, যার প্রভাব খেলাপির হারে পড়েছে।




