দেশের শিক্ষা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এই বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হবে, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। এই উদ্যোগের ফলে প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের একটি মূল্যবান বছর বাঁচিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন এবং ২০২৬ সালেই পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এ বছর উচ্চমাধ্যমিকে পাসের হার ছিল ৫২.১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। মোট ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন, যার মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ (৬১.৮০%) এবং বরিশাল বোর্ডে সর্বনিম্ন (৪৪.৮৪%)। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ইংরেজি (৪০.৯৯%) এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি (২৩.৩১%) বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। এছাড়া ২৯৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি, বিপরীতে ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ কৃতকার্যর হার দেখা গেছে।

শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপদেষ্টা এই সম্পূরক পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়ার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থা চালু আছে। যেমন, ভারতে সিবিএসই বোর্ড সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ে অকৃতকার্যদের জন্য 'সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা'র সুযোগ দেয়। পাকিস্তানে মূল পরীক্ষার ৪০ দিন পর এবং নেপালে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এই সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি যুক্তরাজ্যের জিসিএসই পরীক্ষায় ইংরেজি ও গণিতে সম্পূরক পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার নামকরণ, কারা এই সুযোগ পাবেন (যেমন: অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিতরা বা মানোন্নয়ন প্রত্যাশীরা), এবং পরীক্ষার পদ্ধতি কেমন হবে—তা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর কীভাবে সংরক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, সে বিষয়েও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের মান এবং সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলাফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক ও প্রস্তুতির দিক থেকে কঠিন হতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় দিলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা এবং শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পরিশেষে, এই সুযোগটি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আশীর্বাদ হলেও, মূল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণ চিহ্নিত করে পাঠদান ব্যবস্থার উন্নয়ন করা প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রথমবারেই সফল হতে পারে।