দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সংকটের জেরে চিনি উৎপাদন কারখানাগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাইকারি ব্যবসায়ীদের বাকিতে চিনি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে এবং কেবল নগদ টাকার বিনিময়ে পণ্য সরবরাহ করছে।

রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনি ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহে চিনির দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পাইকারি ও উৎপাদন পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রভাবই খুচরা বাজারে পড়েছে।

পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি এখন ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কেজিপ্রতি ১০৮ থেকে ১১০ টাকার সমান। মিলগেট থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ১০৫ টাকা কেজি দরে এই চিনি সংগ্রহ করছেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও এক বস্তা চিনির দাম ছিল ৫ হাজার টাকা।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় জানা গেছে, সাধারণত বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কেনার জন্য অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে 'সাপ্লাই অর্ডার' বা এসও সংগ্রহ করেন। এরপর সেই অর্ডার দেখিয়ে মিলগেট থেকে পণ্য খালাস করা হয়। বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই পরিচিত ও বড় ব্যবসায়ীদের বাকিতে এসও প্রদান করত। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এখন কোনো কোম্পানিই আর বাকিতে পণ্য দিচ্ছে না।

কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে চিনির সরবরাহ ধরে রাখতে তারা চাহিদার তুলনায় কম পণ্য ছাড়ছে। ফলে পাইকারি ক্রেতাদের কাছ থেকে শুধু নগদ টাকায় চিনি বিক্রি করা হচ্ছে।

দেশে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি পরিশোধন করে বাজারে সরবরাহ করা হয়, আর এই পরিশোধন প্রক্রিয়ায় গ্যাসের প্রয়োজন হয়। গ্যাস সরবরাহ কমে গেলে কারখানার উৎপাদনও কমে যায়। উল্লেখ্য, একসময় দেশের ছয়টি শিল্প গ্রুপ চিনি প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে কেবল তিনটি প্রতিষ্ঠান—মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), সিটি গ্রুপ ও আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারি। এই তিন গ্রুপের যেকোনো একটির উৎপাদন ব্যাহত হলেই বাজারের সরবরাহব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়ে।

চিনি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির পেছনে দুটি কারণ উল্লেখ করেছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত (হোয়াইট সুগার) চিনির দাম বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

গত ২০ আগস্ট রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রধান চিনি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ ভারত। তবে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় সেখানে গত দুই মাসে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ লাখ টন অপরিশোধিত চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে দেশটিতে প্রথম চিনি আমদানি। রয়টার্স আরও জানিয়েছে, ২০ আগস্ট থেকে ভারত শুল্কমুক্ত চিনি আমদানির অনুমতি দিলে বিশ্ববাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত উভয় ধরনের চিনির দাম বেড়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা জানান, কিছুদিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত চিনির দাম ৭০ থেকে ৮০ ডলার বেড়েছে। স্থানীয় বাজারে দাম বৃদ্ধির এটি প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে সরবরাহ কমে যাওয়াও মূল্যবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

গত সোমবার রাজধানীর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে চিনি বিক্রির প্রধান পাইকারি কেন্দ্রে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চিনির মজুত কম। খুচরা ক্রেতারা এলে তাঁদের কাছে শুধু নগদ টাকার বিনিময়ে চিনি বিক্রি করা হচ্ছে।

মৌলভীবাজারের গুলবদন সুপারমার্কেটের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী ও মেসার্স ইয়াছিন স্টোরের স্বত্বাধিকারী এস এম শরিফুল ইসলাম বলেন, আগে কোম্পানিগুলো ২০ থেকে ৩০ দিনের জন্য বাকিতে পণ্য সরবরাহ করত। এখন নগদ টাকা ছাড়া তারা কোনো পণ্য দিচ্ছে না, যার ফলে বাজারে চিনির সরবরাহ কমে গেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চিনি উৎপাদনকারী একটি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখতে বাকিতে চিনি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।