বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ লোককাহিনি ও পালাগান, যা সামাজিক বিনোদনের পাশাপাশি নীতিশিক্ষা ও লোকশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। প্রেম, হাস্যরস, অলৌকিকতা এবং মানবিক বেদনার সংমিশ্রণে তৈরি এই পালাগানগুলো গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য দলিল। এই সমৃদ্ধ লোকঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এবং দীনেশচন্দ্র সেনের মৈমনসিংহ গীতিকার প্রভাব বিশ্লেষণ করে সম্প্রতি একটি নতুন গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। ইউসুফ হাসান অর্ক রচিত এই বইটিতে মূলত লোককাহিনিগুলোর মঞ্চ-পরিবাহণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এর বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
পুরো গ্রন্থটিকে পাঁচটি প্রধান অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে লেখক দীনেশচন্দ্র সেনের জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করেছেন। বিশেষ করে, প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাওয়া বাঙালিয়ানার চিহ্ন হিসেবে পালাগানগুলোকে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজের সামনে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে সেনের অবদানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লেখকের শৈশবের সাহিত্যিক পরিবেশ কীভাবে তাঁকে পরবর্তী জীবনে বাংলার ইতিহাস ও লোকসাহিত্যের একজন প্রথিতযশা গবেষক হিসেবে গড়ে তুলল, তা এখানে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে দীনেশচন্দ্র সেনকে 'নাবিকের বাতিঘর' হিসেবে অভিহিত করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব আলোচনা করা হয়েছে। মৈমনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার চার খণ্ড গ্রন্থের পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁকে একজন বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক গবেষক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও সংগৃহীত পালাগানগুলোর পরিবেশনরীতির অভাবের বিষয়টি লেখক গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন।
বইটির তৃতীয় অধ্যায়ে 'মলুয়া' লোককাহিনির নগরকেন্দ্রিক পরিবেশনার দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিবেশিত এই নাটকের পাণ্ডুলিপিকে বন্দনা, মূল কাহিনি ও সমাপনী—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এর সংগীত, পোশাক এবং ভাষাশৈলীতে নাগরিক মঞ্চের আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। চতুর্থ অধ্যায়ে 'চন্দ্রাবতী' পালাগানের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশনা শৈলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। গবেষকদের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে মূল পাণ্ডুলিপি ও প্রযোজনা পাণ্ডুলিপির মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা এখানে দেখানো হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পালাটি মঞ্চস্থ করার সময় ইউরোপীয় থিয়েটারের আলো, পোশাক এবং চরিত্রের প্রবেশ-প্রস্থানের কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল।
গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ে 'মহুয়া' পালার তিনটি ভিন্ন পাঠের ভিত্তিতে একটি নবনাটলিপি তৈরির প্রক্রিয়া ও প্রযোজনার পর্যায়গুলো বর্ণিত হয়েছে। এই নতুন লিপিতে দৃশ্য এবং চরিত্রের কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং আধুনিক থিয়েটারের আলোর কারুকাজ ও পোশাকের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। বইটির পরিশিষ্ট অংশে তিনটি পালাগানের মঞ্চায়নের বিভিন্ন আলোকচিত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।
মলুয়া, মহুয়া ও চন্দ্রাবতীর মতো পালাগানগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বাংলার সাধারণ মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল। বর্তমানে এই লোকজ উপাদানগুলো শহুরে জীবনের বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। দর্শক আকর্ষণের লক্ষ্যে প্রযোজনা, চরিত্রের পরিবর্তন এবং মঞ্চ নির্দেশনার যে সূক্ষ্ম কৌশলগুলো ব্যবহৃত হয়, লেখক তাঁর লেখায় অত্যন্ত নিপুণভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। লোকসাহিত্যের প্রতি মানুষের চিরন্তন আগ্রহ এবং আধুনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হওয়ার প্রত্যাশার মধ্য দিয়েই লেখাটি শেষ হয়েছে।




