তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীনে 'গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ' শীর্ষক একটি প্রকল্পের আওতায় ১২টি সফটওয়্যার ও টুল তৈরি করা হয়েছে, যার পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলমান এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও সহজতর করা। তবে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মাঝে সেবার প্রসার ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্যানুসারে, মোট ৮০ কোটি টাকার ব্যয়ের মধ্যে ৬০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং এবং সংরক্ষণে। বাকি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বিভিন্ন সভা-সেমিনার, অফিস-সজ্জা ও প্রচারণামূলক ক্যাম্পেইনের পেছনে। এই প্রকল্পের অধীনে 'কাগজডটএআই' নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে, যেখানে ছবি বা নথি থেকে লেখা রূপান্তরের (OCR) সুবিধা রয়েছে। তবে দেখা যাচ্ছে, গুগল লেন্সের মতো বিনামূল্যে পাওয়া অনেক অ্যাপের তুলনায় এই সরকারি সেবার ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওসিআর সেবায় দিনে গড়ে মাত্র ৫০টি অনুরোধ আসে। অন্যদিকে, সরকারি তথ্য প্রদানকারী এআই চ্যাটবট 'জিজ্ঞাসা'-র ক্ষেত্রেও দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা মাত্র ১১০টি। তবে বানান যাচাই সেবার ব্যবহার তুলনামূলক বেশি, যেখানে দিনে গড়ে প্রায় ৫ লাখ অনুরোধ জমা পড়ে।
প্রকল্পটি ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয় এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এর বাস্তবায়ন করে। ১৫৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ তিনবার বাড়ানো হয়েছে এবং সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা স্বীকার করেছেন যে, প্রকল্পের সব কাজ অর্থবহ হয়নি এবং টুলগুলো মানুষের কাছে যেভাবে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেভাবে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি জানান, বর্তমানে এসব টুলকে আরও ব্যবহারবান্ধব করার কাজ চলছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে, বিশেষ করে জিপিইউ-এর অভাবের ফলে একসাথে অনেক ব্যবহারকারী এই সেবা নিতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞরা এবং তদন্ত কমিটি ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে আইসিটি খাতে ব্যাপক অপচয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্পের কার্যক্রমের সাথে মূল উদ্দেশ্যের কোনো মিল ছিল না। অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, মোবাইল গেম ও অ্যাপ তৈরির এক প্রকল্পে ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই অকেজো এবং উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হয়েছে নির্দিষ্ট প্রভাবশালীদের সিনেমা ও গেম তৈরিতে।
প্রকল্পের defending পক্ষ দাবি করছে, তারা কেবল সফটওয়্যার নয়, বরং বিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে ৮ হাজার কপিরাইটমুক্ত ডিজিটাল বই, ১০ হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত এবং ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তথ্য। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, কেবল উপাত্ত সংগ্রহের হিসাব দিয়ে সাফল্য বিচার করা ভুল; বরং প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং স্থায়িত্বই আসল বিষয়। অতীতের দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে না দেখে কেবল প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়া পুরোনো অনিয়মকেই প্রশ্রয় দেওয়া বলে তিনি মনে করেন।




