দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় এবার ব্যাপক কাঠামোগত পরিবর্তন আনল কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন এই নীতিমালার আওতায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় পাল্টানোর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রমণ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করার কৌশলও রুখে দিতে চায় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানী ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী টনি বার্ক এই নতুন নীতির খসড়া উপস্থাপন করেন। এর আগে বুধবারই অভিবাসন খাতে বড় ধরনের সংশোধনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সরকারি কর্মকর্তারা। টনি বার্ক তার বক্তৃতায় ‘অভিবাসন কর্মসূচি পরিচালনা: কারা আসবেন, কারা থাকবেন, কারা চলে যাবেন’ শীর্ষক পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় বার্ষিক নিট অভিবাসীর সংখ্যা কমিয়ে ২ লাখ ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনা হবে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে বছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে সীমিত রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত গত এক বছরে নিট অভিবাসন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০ জনে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং ২০২২ সালের মাঝামাঝির পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন হিসেব।
নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘ভিসা হপিং’ বন্ধে কঠোর অবস্থান। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিদেশি শিক্ষার্থীরা যাতে নিম্নমানের কোর্সে ভর্তি হয়ে বারবার ভিসা পরিবর্তন করতে না পারেন, সেজন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে যারা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করছেন তারা এই নিয়ম থেকে অব্যাহতি পাবেন বলে জানিয়েছেন টনি বার্ক। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের আবেদনকারীদের জন্যও বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যেতে পারবেন।
ভ্রমণ ভিসায় অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অবস্থান দীর্ঘায়িত করার পথ বন্ধে সব ধরনের পর্যটন ভিসায় ‘নো ফারদার স্টে’ শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে পর্যটক হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে সেখানে অন্য কোনো ভিসায় আবেদন করার সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে যাবে। যাদের ভিসার বৈধ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের দ্রুত দেশে ফেরত পাঠাতে নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
কৃষি ও সেবা খাতের ‘ওয়ার্কিং হলিডে’ ভিসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের অনুমোদনের ক্ষেত্রে লটারি ব্যবস্থা চালু করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষির মতো যে খাতগুলোতে শ্রমঘাটতি রয়েছে, সেখানে দক্ষ অভিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন এবং বিদ্বেষমূলক অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের ভিসা দ্রুত বাতিল করে তাদের বহিষ্কারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে অভিবাসন কর্মকর্তাদের।
নতুন এই নীতির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিদেশি শিক্ষার্থীরা। সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনের মতো প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে সড়কে নেমে আসে। সিডনির হাইড পার্কে অনুষ্ঠিত সমাবেশে শিক্ষার্থীরা জানান, এত বড় অঙ্কের টিউশন ফি দিয়ে তারা বৈধভাবে পড়াশোনা করতে এসেছেন। কিন্তু ঘন ঘন নিয়ম পরিবর্তন এবং এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের ভবিষ্যৎ এখন হুমকির মুখে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে তীব্র উৎকণ্ঠা। সিডনির ড্যানহ্যাম কোর্ট এলাকায় বসবাসকারী এক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বলেছেন, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তারা। লাকেম্বা শহরের আরেক শিক্ষার্থী জানান, যারা অস্থায়ী ভিসায় কঠোর পরিশ্রম করে এ দেশে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছেন, নতুন সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধাক্কা। যেকোনো সময় দেশে ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
টনি বার্ক অবশ্য বলেছেন, যারা সততার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখতে আসবেন, তাদের স্বাগত জানানো হবে। তবে অভিবাসন ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কেউ অনিয়ম বা অন্যায্য সুযোগ নিতে চাইলে তা বরদাশত করা হবে না। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, এমন কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।




