যশোরের অভয়নগর উপজেলায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। একটি অস্তিত্বহীন বিদ্যালয়ের সংস্কারের নামে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভয়নগর উপজেলা প্রশাসন ‘সিদ্দিপাশা ভৈরব কিন্ডারগার্টেন স্কুলের’ জন্য এই বরাদ্দ দেয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বরাদ্দ হলেও গত ২০ এপ্রিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টাকাটি উত্তোলন করা হয়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, সিদ্দিপাশা ইউনিয়ন ও গ্রামের নামে কোনো বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ও জানিয়েছে, ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান উপজেলায় নিবন্ধিত নেই। এই অস্তিত্বহীন বিদ্যালয়ের সংস্কারকাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ‘সম্পন্ন’ দেখানো হয়েছে, যা পাঁচ লাখ টাকার কম ব্যয়ের ছোট প্রকল্পে স্থানীয় প্রতিনিধিদের দিয়ে করা হয়। প্রকল্পটির সভাপতি সিদ্দিপাশা ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আবুল কাশেম অবশ্য দাবি করেছেন, স্কুলটি আছে এবং তিনি এর কাজ করেছেন।
অভয়নগরের ইউএনও শেখ সালাউদ্দীন প্রথম আলোকে জানান, খবর পেয়ে তিনি ১১ জুলাই ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, ‘সিদ্দিপাশা ভৈরব কিন্ডারগার্টেন স্কুল’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই; তবে ‘সিদ্দিপাশা ভৈরব আদর্শ শিশু বিদ্যালয়’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে বরাদ্দের টাকায় কাজ করানো হয়েছে। পরবর্তীতে ১৩ আগস্ট গিয়ে ওই বিদ্যালয়ের পরিচালক দাউদ হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি কখনো সরকারি কোনো অনুদান পাননি। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে এক লাখ টাকা বরাদ্দ আছে এবং তিনি মাত্র ছয়টি জানালার গ্রিল দিয়েছেন, অথচ দুটি দরজা, দুটি জানালা ও ২০ সেট বেঞ্চের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্যাডে প্রত্যয়নপত্র নেওয়া হয়েছে।
শুধু এটিই নয়, একই অর্থবছরে অভয়নগরে এডিপির আওতায় মোট ২২৩টি উন্নয়নকাজের বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৫ লাখ ৮ হাজার ৪১৮ টাকা। এর মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে ১০৬টি কাজ ঠিকাদারদের দিয়ে করা হয়েছে, আর বাকি ১১৭টি কাজ হয়েছে পিআইসির মাধ্যমে। এসব কাজের তদারকির দায়িত্বে ছিল এলজিইডি। প্রথম আলোর প্রতিবেদক গত জুলাই মাসে ২৩টি প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এতে দেখা যায়, পিআইসির পাঁচটি প্রকল্পে কোনো কাজই হয়নি, দুটির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি, আর দুটিতে মোটামুটি কাজ হয়েছে। তবে দরপত্রের মাধ্যমে হওয়া ১২টি প্রকল্পের সবকটিতেই কাজ হয়েছে।
সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের ‘ইমান আলীর বাড়ি থেকে আকরামের বাড়ির রাস্তা ইটের সলিংকরণে’ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও গ্রামবাসী জানান, রাস্তাটি চার-পাঁচ বছর আগের পুরোনো, সম্প্রতি একটি নতুন ইটও বসানো হয়নি। প্রকল্পের সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান অবশ্য দাবি করেন, রাস্তার কাজ হয়েছে। পায়রা ইউনিয়নের ‘দামুখালী প্রফুল্ল হালদারের বাড়ির পাশে ইউড্রেন নির্মাণ’ প্রকল্পের টাকা উত্তোলন হলেও ঘটনাস্থলে নতুন কোনো ইউড্রেন পাওয়া যায়নি, তবে পাশের সড়কে কিছু নতুন ইট ও বালু দিয়ে সংস্কারের চেষ্টা হয়েছে। প্রেমবাগ ইউনিয়নের ‘চেঙ্গুটিয়া পিন্টুর বাড়ির পাশে ইউড্রেন নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজ ২ এপ্রিল সমাপ্ত দেখানো হলেও ২ জুলাই সেখানে নতুন কোনো ইউড্রেন ছিল না। প্রকল্পের সভাপতি হালিমা পারভীন স্বীকার করেছেন, আগে টাকা তোলা ভুল হয়েছে, পরে কাজ করে দেওয়া হয়েছে।
পিআইসির মাধ্যমে ‘প্রেমবাগ ইউনিয়নের বিভিন্ন গরিব পরিবারে অগভীর নলকূপ স্থাপন’ প্রকল্পে ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০টি পরিবারে নলকূপ দেওয়ার কথা থাকলেও তালিকাভুক্ত দুজন পাননি। এমনকি ইউপি সদস্যের স্ত্রীও একটি নলকূপ পেয়েছেন। তালিকায় নাম থাকা গোলাম রসুল দাবি করেছেন, তিনি কোনো সরকারি টিউবওয়েল পাননি। প্রকল্পের সভাপতি জসিম উদ্দীন অবশ্য দাবি করেন, তালিকাভুক্ত সবাই নলকূপ পেয়েছেন।
যশোরের ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদের মতে, এসব প্রকল্প অনেকটা গোপনে নেওয়ায় টাকা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. নাজমুল হুদা বর্তমানে অন্য দায়িত্বে থাকায় প্রথম আলোর একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। ইউএনও শেখ সালাউদ্দীন জানান, কাজ না হওয়া প্রকল্পগুলোর তালিকা করে তিনি নিজে পরিদর্শন করে কাজ করিয়ে নিয়েছেন।




