শরীরের রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, মেটাবলিজম, প্রজনন এবং তাপনিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন। তবে এই হরমোনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তাকে হাইপার-থাইরয়েডিজম এবং কম হলে হাইপো-থাইরয়েডিজম বলা হয়। থাইরয়েডের এই জটিলতা কেবল শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং চোখের মারাত্মক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং মার্কস মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. ছায়েদুল হক জানান, থাইরয়েডজনিত সমস্যার কারণে চোখে এক ধরণের অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সঠিকভাবে কাজ করে না এবং চক্ষুকোঠরের মাংসপেশি, ফ্যাট ও অন্যান্য কোষে প্রদাহ ও তরলের আধিক্য দেখা দেয়। এই অবস্থাকে মায়োপ্যাথি বলা হয়, যেখানে চোখের মাংসপেশি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে।
এই সমস্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যখন ফুলে যাওয়া মাংসপেশিগুলো অপটিক নার্ভ বা দৃষ্টি পরিবাহী স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তখন তাকে অপটিক নিউরোপ্যাথি বলা হয়। এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, কারণ দ্রুত চিকিৎসা না করালে রোগী স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যেতে পারে। এছাড়া চক্ষুকোঠরে জায়গা কমে যাওয়ায় চোখের গোলক সামনের দিকে ঠেলে বেরিয়ে আসে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রোপ্টোসিস বলা হয়। এই সবের পাশাপাশি চোখে লালচে ভাব, ড্রাই আই বা খচখচ করা এবং একটি বস্তুকে দুটি দেখার মতো (ডাবল ভিশন) লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসা প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রথম দুই থেকে তিন বছর এই সমস্যাটি সক্রিয় থাকে এবং পরবর্তীতে তা নিজে থেকেই নিষ্ক্রিয় বা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। তবে লক্ষণভেদে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। যেমন, ড্রাই আইয়ের ক্ষেত্রে 'আর্টিফিশিয়াল টিয়ার' ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, ডাবল ভিশন বা অপটিক নার্ভে চাপের মতো গুরুতর সমস্যায় দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করতে হয়। পরিস্থিতি জটিল হলে রেডিওথেরাপি এমনকি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও পড়তে পারে।
ঝুঁকির কথা বলতে গিয়ে ডা. হক জানান, এই সমস্যায় পুরুষের তুলনায় নারীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা পাঁচ গুণ বেশি। এছাড়া ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়। সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সীরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। বংশগত প্রভাব এবং রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন চিকিৎসায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।




