আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মহলে নজিরবিহীন এক সন্ধ্যা উপহার দিল কান চলচ্চিত্র উৎসব। সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র হুবহু নতুন করে সাজানো সংস্করণটি প্রদর্শিত হলো কানের বুন্য়েল থিয়েটারে। ৫৫ বছর পর রেস্টোরেশনের পর ছবিটি গত বছর কান ক্ল্যাসিকস বিভাগে প্রথম দেখানো হয়। এবারের বিশেষ প্রদর্শনীতে ছবিটির প্রধান দুই অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর এবং সিমি গারেওয়াল উপস্থিত ছিলেন। সবুজ শাড়িতে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন শর্মিলা ঠাকুর, আর সাদা পোশাকে সিমি গারেওয়াল অতীতের স্মৃতিচারণায় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আমেরিকান পরিচালক ওয়েস অ্যান্ডারসন এই প্রদর্শনীর সূচনা করেন এবং তিনি সত্যজিৎ রায়ের এই ছবিকে 'সাইকোলজিক্যাল মিডসামার নাইট স্পেল' হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি জানান, ছবিটির সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই, তিনি শুধুই এক ভক্ত হিসেবে এসেছেন। ২৫ বছর আগে নিউ জার্সির এক দোকান থেকে ঝাপসা নকল ডিভিডিতে এই ছবি দেখার কথা স্মরণ করেন তিনি। প্রদর্শনী শেষে প্রায় দুই মিনিট ধরে দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে শর্মিলা ও সিমিকে সম্মান জানায়। শর্মিলা ঠাকুর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, এই ছবির কলাকুশলীদের মধ্যে এখন শুধু তিনি আর সিমি জীবিত। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্টাইলিশ ব্যক্তিত্বের কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। সিমি গারেওয়াল বলেন, ৫৬ বছর আগে সভ্যতা থেকে দূরে জঙ্গলে শুটিং হয়েছিল, সেখানে বিদ্যুৎ বা পানির মতো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসও ছিল না। তবুও সত্যজিৎ রায়ের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা ছিল তার জীবনের এক বিশাল সৌভাগ্য। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শর্মিলা ঠাকুর ঢাকায় এলে লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এবং এবার কানে সেই পরিচিত মুখে হাসি দেখে লেখকও উচ্ছ্বসিত হন। যদিও আয়োজকদের নিয়মের কারণে তিনি সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হননি, তবে ছবি তুলতে আপত্তি করেননি। প্রদর্শনীতে আলেহান্দ্র ইনারিতু এবং দারিয়াস খোন্দজির মতো চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরাও দর্শকাসনে উপস্থিত ছিলেন। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে ছবিটি শুরু হয় এবং পরবর্তী ১১৫ মিনিট দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন। শ্রেণি-সচেতনতা, বাঙালি পুরুষের স্বার্থপরতা এবং ষাটের দশকের সম্পর্কের জটিলতা উঠে আসে ছবিতে। রবি ঘোষের হাস্যরস দর্শকদের হাসায়। ঝকঝকে ছবি, ৫.১ মিক্স এবং নতুন সাবটাইটেলে ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে নতুন জীবন পেয়েছে। প্রদর্শনী শেষে ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল, আর লেখক মনে মনে ভাবছিলেন, ৫৫ বছরে অনেক কিছু বদলেছে, তবু ১১৫ মিনিটের এই সম্মোহন আজও অবিকল।