সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চলে টহল ব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনের সুফল মিলেছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ২৪ হাজার ৬৪৮ ফুট মালা ফাঁদ। ওই সময়ে হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছিল ৭৯৩ কেজি। কিন্তু পরের এক বছরে (মে ২০২৫ থেকে এপ্রিল ২০২৬) বনকর্মীদের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট ফাঁদ। একই সময়ে হরিণের মাংস জব্দের পরিমাণ নেমে এসেছে ২৫০ কেজিতে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গহিন সুন্দরবনে নিয়মিত টহলের ধরণ বদলে দেওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শুধু হরিণ শিকারই যে কমেছে তা নয়, বাঘসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীও এখন অনেকাংশে নিরাপদ। আগে বনকর্মীরা মূলত খাল অথবা খালের পাড় দিয়ে জলযানে চড়ে টহল দিতেন। বর্তমানে বনের ভেতরে ‘প্যারালাল লাইন সার্চিং’ পদ্ধতিতে দলবদ্ধভাবে হেঁটে টহল বাড়ানোয় বিপুল সংখ্যক ফাঁদ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাব পড়েছিল সুন্দরবনেও। নতুন করে দস্যুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। বেড়ে যায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, বন্যপ্রাণী শিকার, অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, এমনকি বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার মতো অপরাধও। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ টহলের নতুন কৌশল গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগও একই পদ্ধতি অনুসরণ শুরু করে।

গত এক বছরে (মে ২০২৫-এপ্রিল ২০২৬) বন বিভাগ ৮১৩টি সিটকা ফাঁদ এবং ২ হাজার ২৯৪টি হাঁটা ফাঁদও উদ্ধার করেছে। ফাঁদ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বাঘ, হরিণ, শূকর, বানরসহ কমপক্ষে ১৫টি প্রাণী। ফাঁদ পাতার অভিযোগে ৭০ জন শিকারিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বিপজ্জনক হলেও এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে বহু বন্য প্রাণীর জীবন রক্ষা পাচ্ছে বলে মত বন বিভাগের। ফাঁদে আটকে পড়া আহত প্রাণীদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে আহত একটি বাঘিনীকে উদ্ধার করে সুস্থ করে তোলার পর ১৩ জুলাই তাকে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বন বিভাগের ভাষ্যমতে, ‘প্যারালাল লাইন সার্চিং’ পদ্ধতিতে বনকর্মীরা বনের ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একটি লাইন করে হেঁটে চলেন। মৌয়ালরা যেমন হেঁটে হেঁটে মৌচাক খোঁজেন, প্রায় সেভাবেই এই টহল পরিচালিত হয়। দলের ছয় থেকে সাতজন সদস্য চিরুনির মতো করে এলাকা তল্লাশি করেন। দুর্গম এলাকায় এই টহল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সাপ, বাঘ কিংবা কুমিরের আক্রমণের আশঙ্কা থেকেই যায়।

কটকা অভয়ারণ্য কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তানভির হাসান জানান, প্রতিটি স্টেশনে কিছু হটস্পট এলাকা আছে যেখানে ফাঁদ পাতা হয় বেশি। যেমন তার এলাকায় জামতলা অঞ্চলে এভাবে বেশি টহল দেওয়া হয়। টহল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একটি অ্যাপও রয়েছে, যেখানে জিপিএসের সাহায্যে প্রতিদিন কোন স্টেশনের দল কোথায় কতটুকু হেঁটেছে তা মনিটর করা হয়। পূর্ব সুন্দরবনে ৪৩টি ফরেস্ট স্টেশন ও ক্যাম্প রয়েছে। প্রতিটি ইউনিট নিয়মিত টহলের পাশাপাশি একদিন পরপর ফাঁদ অনুসন্ধান করে। এছাড়া স্মার্ট প্যাট্রোলিং ও ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দ্বীপন চন্দ্র দাস জানান, প্রতি রেঞ্জে মাসে একবার আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে স্পিডবোটে টানা সপ্তাহব্যাপী টহল চলে। প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, বনকর্মীদের হেঁটে টহল দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। হাজার হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে।

পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেখানে নিয়মিতভাবে এই পদ্ধতিতে টহল দেওয়া হচ্ছে। জোয়ারের সময় নৌযানে টহল চালানো হয়, আর ভাটার সময় বনরক্ষীরা বনের ভেতরে হেঁটে চিরুনি অভিযানের মতো এলাকা তল্লাশি করেন। এতে দ্রুত ফাঁদ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। সম্প্রতি ৩ জুলাই কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের সত্যপীর খাল এলাকায় টহলের সময় ফাঁদে আটকে থাকা একটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেখান থেকে আরও ১২টি ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।

সুন্দরবনে ‘মালা ফাঁদ’ সাধারণত চিকন দড়ি বা রশি দিয়ে তৈরি করা হয়। কখনো কখনো জিআই তার বা গুনাও ব্যবহার হয়। গাছের গোড়ার দিকে বৃত্তাকারে এ ফাঁদ পাতা হয়, যাতে দৌড়ে যাওয়া হরিণ আটকে পড়ে। এই ফাঁদে আটকে পড়লে যে কোনো প্রাণীই ছুটতে পারে না। ২০১২ সালে খুলনা রেঞ্জে তিন পায়ের একটি বাঘ দেখা গিয়েছিল। পূর্ব সুন্দরবনের ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী মনে করেন, নাইলনের রশি ফাঁদ থেকেই ওই বাঘের একটি পা কেটে গিয়েছিল। ফাঁদ থেকে নিজেকে ছাড়াতে গেলে রশি মাংসপেশি কেটে আরও গভীরে ঢুকে যায়।

গত এক বছরে পূর্ব সুন্দরবনে ৪৭৪টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২৪১টি মামলায় ৩৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ৩৯৬ জনের বিরুদ্ধে বন মামলা দায়ের করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে বরগুনার পাথরঘাটার জ্ঞানপাড়া ও চরদুয়ানিতে দুটি ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। প্রায় ১৫০ জন চিহ্নিত শিকারির তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বাঘ ও হরিণ—এই দুটি প্রাণীকে রক্ষা করা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে এবং বন অপরাধে জড়িতদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।