চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে যুবদল কর্মী জিহাদুর রহমান হত্যার ঘটনায় ছাত্রদলের দুই নেতা আসামি হয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই হত্যার পেছনে ছিল এলাকায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছরে নগরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক সংঘর্ষ, গুলি, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমাতে সন্ত্রাসী ভাড়া করার অভিযোগও রয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পুলিশ ও আদালতের নথি, দলীয় সিদ্ধান্ত এবং ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশির ভাগ সহিংস ঘটনার মূলে ছিল নিজ গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জায়গা দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি কাজ, ঘাট-বাজারের আয় এবং নির্মাণ প্রকল্পে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ।
গত ২৮ জুন থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত শহরের অন্তত ৩০টি এলাকায় শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে প্রথম আলো। দেখা গেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ আয়ের উৎসগুলোরও নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। আগে এসব খাতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠদের প্রভাব ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ঘাট, বিলবোর্ড, রেল, নির্মাণ, সরকারি জমি ও পরিবহনে পুরোনো চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে এসেছে নতুন মুখ। কোথাও সরাসরি বিএনপি নেতা, কোথাও যুবদল-ছাত্রদলের নেতা-কর্মী, আবার কোথাও বড় নেতার অনুসারী পরিচয়ে দখল ও ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা ঘটছে। তবে আইনি ব্যবস্থার তুলনায় শাস্তির হার কম। অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার বা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁওয়ে টার্ফের দখল নিয়ে সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন হত্যা, ১৮ নভেম্বর এমইএস কলেজে গুলি, ১৫ ডিসেম্বর কাজীর দেউড়িতে গুলি, ২০২৫ সালের ২১ মার্চ জিইসি মোড়ে জিহাদুর রহমান হত্যা, ২৫ অক্টোবর বাকলিয়ায় সাজ্জাদ হত্যা, ৫ নভেম্বর বায়েজিদে সরোয়ার হোসেন হত্যা, সল্টগোলা ঘাটের নিয়ন্ত্রণ, খুলশীতে শফিউল বারীর প্লট দখল, তুলাতলীতে খাসজমি দখল, ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রেল কর্মকর্তার দপ্তরে হুমকি, ২৭ এপ্রিল চাঁদা না পেয়ে সম্পত্তি ভাঙচুর, ৫ মে দামপাড়ায় পুলিশের ওপর হামলা, ৫ জুন ফয়’স লেকে সরকারি জমি নিয়ে গোলাগুলি, ৩০ জুন রেলের দরপত্র জমা দিতে গিয়ে ঠিকাদার কার্তিক রঞ্জন শীলের ওপর হামলা এবং আগে আরেক ঠিকাদার হুমায়ুনকে মারধর।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেছেন, সন্ত্রাসীর কোনো পরিচয় নেই, যে পরিচয়েই থাকুক কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, অপরাধের তুলনায় শাস্তির হার কম।
২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পুরাতন চান্দগাঁও এলাকায় চান্দগাঁও স্পোর্টস জোনে টার্ফের দখল নিয়ে যুবদলের দুটি পক্ষের সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন নিহত হন। ঘটনার পরদিন মহানগর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং দুজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। গত বছরের ২১ মার্চ জিহাদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১৭ জন আসামি, যার মধ্যে নগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শরীফুল আলম তুহিন ও খুলশী থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব নুর আলম সোহাগ রয়েছেন। তুহিন হলেন মোশাররফ হোসেন দীপ্তির অনুসারী, যিনি এখনো শহরের বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
গত বছরের ২৫ অক্টোবর বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে গোলাগুলিতে ছাত্রদল কর্মী সাজ্জাদ নিহত হন। মামলার ১৭ আসামির মধ্যে যুবদলের পদপ্রত্যাশী বোরহান উদ্দিন ও তাঁতী লীগের নেতা নজরুল ইসলাম রয়েছেন। সাজ্জাদের বাবা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় যেন আসামি বোরহানের বিচারের পথে বাধা না হয়।
খুলশীর লেক ভ্যালি সোসাইটিতে তিন কোটি টাকা মূল্যের প্লট দখলের ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার নাম এসেছে। প্লটের মালিক এস এম শফিউল বারী ১৯৮২ সালে জমিটি কেনেন বলে দাবি করেন। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্লটটি দখল করে নেওয়া হয়। পুলিশের তদন্তে অবৈধভাবে প্লট দখলের কথা বলা হয় এবং দুই ভাই সাহাব উদ্দিন আকন্দ ও এনামুল হক আকন্দের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়। অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্য রাজীব উদ্দিন আকন্দ নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি অবশ্য নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, চাচাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব রয়েছে।
সরকারি জমি দখল নিয়ে ফয়’স লেকে গোলাগুলির ঘটনায় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার নাম এসেছে। তাঁকে ৮ জুন স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। খুলশীর ডিসিপুল আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শেখ মো. আরিফের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং না পাওয়ায় সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, ওয়াকিলের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার মতো কর্মকাণ্ড চলছে, ফলে এলাকার লোকজন প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পান না। ওয়াকিল অবশ্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেছেন।
বাকলিয়া তুলাতলী এলাকায় সড়কসংলগ্ন খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে বাকলিয়া ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি নবাব খানের বিরুদ্ধে। এতে প্রায় ১৫০টি পরিবার চলাচলের পথ হারিয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নবাব খান বলেছেন, 'আমি কিছু বলব না, যা পারেন লিখে দেন।'
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১৯টি ঘাটের মধ্যে সল্টগোলা ঘাটটি দুই বছর ধরে ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশনের নামে সরকারি রাজস্বের টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ রয়েছে। ঘাটটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আহাদ রিপন ও নগর ছাত্রদলের সাবেক ছাত্রকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ওয়াহিদ ইমরান খানকে। মাসের ১৫ দিন করে দুজন টাকা তোলেন। স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রতিদিন আনুমানিক ৩৬ হাজার টাকা আদায় হলেও করপোরেশন পায় মাত্র ছয় হাজার টাকা। সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যদি তাঁরা ঘাট সংস্কার না করে থাকেন তাহলে চুক্তি বাতিল করা হবে।
রেলের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ভবনে শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীরা গিয়ে কর্মকর্তাকে হুমকি দেন। গত ৩০ জুন পাহাড়তলীতে দরপত্র জমা দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন ঠিকাদার কার্তিক রঞ্জন শীল। যুবদল নেতা রাসেল খান মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কার্তিক চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছেন এবং মামলা করেননি। আরও পাঁচজন ঠিকাদার প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি।
চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতিতে এখন মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের প্রভাব বেড়েছে বলে দলীয় সূত্র জানায়। তিনি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন দীপ্তি। সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে মীর হেলালের ছবি সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত। বাবলা হত্যাকাণ্ডের মামলায় বড় সাজ্জাদ ও ছোট সাজ্জাদকে আসামি করা হয়েছে। নিহত বাবলার ভাই আজিজ উদ্দিন এই হত্যায় মীর হেলালের জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন।
বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ৬০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বহিষ্কারের পরও অভিযোগ থামেনি। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচিত সরকার এসব থামাতে না পারলে চট্টগ্রামের মানুষের স্বস্তি ফিরবে না।




