কৃত্রিমেরআদি প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে চারুকলা, সংগীত বা নাট্যকলার মতো সৃজনশীল বিদ্যাশাখায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যখন চ্যাটজিপিটির মতো প্ল্যাটফর্ম লেখালেখি করে দিচ্ছে, মিডজার্নি মুহূর্তের মধ্যে ছবি এঁকে দিচ্ছে, তখন সৃজনশীল বিদ্যার চর্চা কতটা টিকে থাকবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃতিমেরআইয়ের কোনো মন বা আবেগ নেই; বর্ষণের দিনে এক কাপ চা নিয়ে জানালার ধারে তাকিয়ে থাকার গভীর অনুভূতি এটি উপলব্ধি করতে পারে না। বড়জোর কোটি কোটি ডেটা ঘেঁটে এটি একটি নিখুঁত শিল্পকর্ম বানিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একজন শিল্পীর ক্যানভাসে তুলির শেষ আঁচড়ের কাঁপন নকল করার ক্ষমতা এর নেই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার গভীরতা বা লালন শাহের ‘অচিন পাখি’-র দর্শন কোনো সিলিকন চিপ বুঝতে পারবে না। একজন মঞ্চশিল্পী যখন দর্শকসামনে রক্তমাংসের উপস্থিতি নিয়ে দাঁড়িয়ে তার চোখের জল আর কণ্ঠের কাঁপন দিয়ে সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করেন, সেই জীবন্ত শিল্পের মূল্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি করা সংবেদনহীন নিখুঁত ছবির চেয়ে অনেক বেশি। লেখক লিও তলস্তয়ের মতে, শিল্পের আসল কাজ হলো একজন ব্যক্তির ভেতরের অনুভূতি অন্যের মধ্যে সংক্রমিত করা, যার মাধ্যমে মানুষে মানুষে তৈরি হয় প্রকৃত ভালোবাসা ও একতা। এআই তথ্যের ভাণ্ডার দিতে পারে, কিন্তু ‘মানুষ’ হওয়ার শিক্ষা দিতে পারে না।
সমাজের কঠোর বাস্তবতায় আমাদের দেশের অভিভাবকেরা সন্তানকে শুধু ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বিসিএস ক্যাডার বানানোর স্বপ্নে বিভোর থাকেন। ফলে আমরা যন্ত্রের মতো কাজ করছি কিন্তু মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি। অথচ উন্নত বিশ্ব ইতিমধ্যেই সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যাথমেটিকস—এসটিইএম-এর সঙ্গে কলা (আর্টস) যুক্ত করে ‘এসটিইএএম’ শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করছে। এমআইটি ও হার্ভার্ডের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি ও ব্যবসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুঝেছে, কেবল কোডিং দিয়ে রোবট বানানো গেলেও নান্দনিক নকশা ছাড়া বাজারে তা বিক্রি হবে না।
গুগল, অ্যাপল, পিক্সারের মতো প্রযুক্তি দৈত্যরা এখন চাকরির জন্য কেবল সিএসই-র ডিগ্রি নয়, বরং চারুকলা, নাট্যকলা বা মানব মনোবিজ্ঞান বোঝেন এমন সৃজনশীল ব্যক্তিদের খুঁজে বের করছে। কারণ, এআইয়ের এই যুগে প্রযুক্তিগত কাজগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই করে দিচ্ছে, কিন্তু অভিনব আইডিয়ার জন্যও এখনো সৃজনশীল মানুষকেই ভরসা হতে হয়। তবে সমস্যা হলো, বাংলাদেশের সৃষ্টিশীল শিক্ষার্থীদের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান ও থ্রি-ডি বা ডিজিটাল টুলসের মতো দক্ষতার ঘাটতি রেয়েছে। শিল্পকর্মকে আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করার কৌশল অনেকেই জানেন না।
কৃত্রিমতিমত্তা মূলত ইন্টারনেটের দুনিয়ার একটি বড় অনুকরণকারী মাত্র; মানুষ যদি নতুন কিছু সৃষ্টি বন্ধ করে, তবে এআইয়ের ডাটার পরিধিও সংকুচিত হবে। সৃজনশীল শিক্ষা মানুষকে ছকের বাইরে নতুন কিছু চিন্তার করার ক্ষমতা দেয়। লালন, রবীন্দ্রনাথ এবং লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য ও প্রাণ টিকিয়ে রাখতেও প্রাতিষ্ঠানিক সৃজনশীল সাধনা অপরিহার্য, যার অভাবে মেধাবীরা দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। সুতরাং, রোবটের ভিড়ে নিজের ভেতরের সংবেদনশীল ও বিবেকবান মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখাই হবে প্রকৃত জয়ের চাবিকাঠি।




