প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত সহায়ক এক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভিষেক ঘটেছে। প্রচলিত পূর্বাভাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে জীবন ও জীবিকা রক্ষায় সম্পূর্ণ বাংলা ভাষার ওয়েবসাইট ‘আবহাওয়া’ এবং তার মোবাইল অ্যাপ ‘আবহাওয়াবিদ’ চালু হয়েছে। উদ্ভাবক ও প্রধান আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল জানান, এটি একটি আবহাওয়ানির্ভর তথ্যব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
ছোটবেলায় কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তায় ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মোস্তফা কামাল। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক এবং আন্তর্জাতিক ফেলোশিপে ভূষিত এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “আমাদের অ্যাপটির মূল উদ্দেশ্য হলো আবহাওয়ার বৈজ্ঞানিক ডেটাকে মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য ও কার্যকর নির্দেশনায় রূপান্তর করা।”
প্ল্যাটফর্মটি কেবল ‘আগামীকাল বৃষ্টি হবে’ জানিয়েই থেমে থাকে না; এটি নির্দিষ্ট করণীয়ও বাতলে দেয়। অ্যাপ ব্যবহারে একজন কৃষক জানতে পারবেন পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় সেচ বন্ধ রাখতে হবে কি না, কিংবা অতিবৃষ্টির আগেই পাকা ধান কাটার প্রয়োজনীয়তা। একইসাথে জেলেরা সমুদ্রগামী হওয়ার আগে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সতর্কতা পেয়ে যাবেন। দেশের প্রায় দেড় কোটি ক্ষুদ্র কৃষক প্রতিদিন যে জলবায়ু-অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হন, এই অ্যাপ তাদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধ নিতে সহায়তা করবে বলে উদ্ভাবক প্রত্যাশা করেন।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অবস্থানভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা প্রেরণ ব্যবস্থা। কোনো একটি নির্দিষ্ট উপজেলা বা জেলার ওপর দিয়ে অগ্রসরমান কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা দেখা দিলে, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়ানো ছাড়াই কেবল ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ব্যবহারকারীদের মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পৌঁছানো সম্ভব হবে। মোস্তফা কামালের ভাষায়, “যদি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ওপর দিয়ে একটি কালবৈশাখী ঝড় বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার দিকে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়, তাহলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষকে বিরক্ত না করে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ব্যবহারকারীদের মোবাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত ও সম্ভাব্য শিলাবৃষ্টির জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো যাবে।” এই প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগে ২০২৭ সালের কালবৈশাকী মৌসুম থেকে বজ্রপাত ও অন্যান্য আকস্মিক দুর্যোগে প্রাণহানি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া অ্যাপ থেকে ভিন্ন, আবহাওয়াবিদ সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও নিজস্ব জলবায় ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি পর্যায়ক্রমে দেশের ৫৫০টিরও বেশি উপজেলার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থানীয় পূর্বাভাস প্রদান করবে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি পরামর্শ, বায়ুদূষণ সূচক, নদী ও উপকূলীয় সতর্কতা এবং ঝড়-বন্যার আগাম বার্তা। অ্যাপটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং কোনো অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই ব্যবহারযোগ্য। বিশেষ করে স্বল্প মূল্যের, কম ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ও ধীরগতি ইন্টারনেটেও এটি সাবলীলভাবে চলতে সক্ষম, যা প্রান্তিক জনগণের জন্য দারুন উপযোগী।
আবহাওয়া অধিদপ্তর শিলাবৃষ্টির তথ্য সংরক্ষণ না করলেও, ‘সিটিজেন সায়েন্স’ বা নাগরিক বিজ্ঞান ও মাঠ প্রতিবেদন সুবিধার আওতায় এই অ্যাপের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো শিলাবৃষ্টির ডাটা সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ শুরু হবে। ব্যবহারকারীদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন জেলার রিয়েল-টাইম আবহাওয়াচিত্র তৈরি হবে। নাগরিকেরা বজ্রপাতে হতাহত, পাহাড়ধস বা জলোচ্ছ্বাসের তথ্য ও ছবি সরাসরি শেয়ার করতে পারবেন, যার সত্যতা যাচাইয়ে থাকছে ভুয়া রিপোর্ট শনাক্তের বিশেষ সুবিধা। অ্যাপটি ডাউনলোডের ব্যবস্থা রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।




