বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন ইরান যুদ্ধের দিকে, কারণ এই সংঘাত সোনার দামে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। স্বর্ণ কি তার ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছে? এ বছরের শুরুর দিকে মূল্যবান এই ধাতুটির দাম ৫,০০০ ডলারের বেশ উপরে উঠলেও বর্তমানে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪,০০০ ডলারে। পৃথিবীর অন্য যেকোনো বস্তুর তুলনায় স্বর্ণ হাজার হাজার বছর ধরে তার প্রকৃত মূল্য ধরে রেখেছে। একটি মুদ্রার মান পরিমাপের জন্য স্বর্ণ ঠিক তেমনই, যেমন দিকনির্দেশনার জন্য ধ্রুবতারা। হলুদ ধাতুটির দামের ওঠানামা আসলে মুদ্রার মানের পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। স্বর্ণ হলো ধ্রুবক।
বর্তমানে যা ঘটছে তা ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, স্বর্ণের প্রকৃত মূল্যের পতন নয়। অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতেও মার্কিন ডলার শক্তিশালী হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হলো, জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম ৫,০০০ ডলার পেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ডলারের অবমূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করেছে। মুদ্রার মান কমানো মানেই মুদ্রাস্ফীতি, যা একটি অর্থনীতির জন্য সবসময় ক্ষতিকর। একইসঙ্গে সহায়ক ভূমিকা পালন করছেন ফেডারেল রিজার্ভের নতুন প্রধান কেভিন ওয়ার্শ, যিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে দমিয়ে না দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় মুদ্রার স্থিতিশীলতার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মনোযোগী করে তুলছেন।
ডলার শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উভয় ধরনের ট্রেজারি সিকিউরিটির সুদের হার কেন বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন, দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারির হার ৪ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর উত্তর লুকিয়ে আছে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে। সরকার বিপুল বাজেট ঘাটতি মেটাতে এবং পরিশোধযোগ্য কোটি কোটি ডলারের বিদ্যমান ঋণ পুনঃঅর্থায়নে প্রচুর ট্রেজারি ইস্যু করছে। যখন ডলার স্বর্ণের সঙ্গে স্থির ছিল, তখন বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী সুদের হারের স্তর ওঠানামা করত।
তবে ডলারের নিম্নমুখী ধারা থেকে পুনরুদ্ধার নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশের কারণ নেই। ২০২২ সালের পর থেকে এটি যথেষ্ট মূল্য হারিয়েছে। তখন স্বর্ণের দাম ছিল আউন্সপ্রতি প্রায় ১,৮০০ ডলার। দুই বছর আগে সেটি বেড়ে হয় ২,৩০০ ডলার এবং গত বছর ৩,৩০০ ডলার। বর্তমানে প্রতি আউন্সের দাম গত গ্রীষ্মের তুলনায় এখনো ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শেয়ারবাজারের ভাষায় এটিকে ভালুক বাজারের র্যালির সমতুল্য বলা যেতে পারে।
চলমান ইরান যুদ্ধ জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে ফেডারেল রিজার্ভের প্রতিক্রিয়াশীল সদস্যরা ওয়ার্শের ওপর সুদের হার বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি যদিও তা প্রতিহত করবেন, তবে এই অনিশ্চয়তা ঋণ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। এছাড়া জাপানি ইয়েন বা ব্রিটিশ পাউন্ডের মতো মুদ্রায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটও শুরু হতে পারে। জাপানের জাতীয় ঋণ আনুপাতিক হারে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিগুণ। দেশটির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় শূন্য সুদে ইস্যু করা সরকারি ঋণপত্রে বোঝাই হয়ে আছে, যা বর্তমানে সেই কাগজপত্রের মূল্য তীব্রভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী যদি তার বক্তব্যের অর্ধেক পরিমাণও আমূল পদক্ষেপ নেন, তাহলে তা দেশটির মুদ্রায় আঘাত হানবে এবং ঘাটতি মেটাতে বন্ড বিক্রির সরকারি সক্ষমতা সীমিত করবে।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি একটি সংকট তৈরি করেছিল, যার ফলে ওয়াশিংটন ডলারের মান কমাতে বাধ্য হয়। এটিই ছিল ১৯৮৭ সালের শেয়ারবাজার ধসের একটি প্রধান কারণ। ফোর্বস মিডিয়ার চেয়ারম্যান ও সম্পাদক-ইন-চিফ স্টিভ ফোর্বস পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, "স্বর্ণ কোনো বিনিয়োগ নয়; এটি আর্থিক সমস্যার বিরুদ্ধে বীমা। এই বীমা ধরে রাখুন।"




