প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার ও প্রতারণা রোধে কার্যকর পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য, বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীরা। ২২ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র মানব পাচারকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক আলি আকবর খান এই প্রসঙ্গে বলেন, পাচারের তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তঃদেশীয় তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ। ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি এবং অনলাইন লেনদেন তদারকি করতে আধুনিক সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনেক ভুক্তভোগী বিদেশ থেকে ফিরে গোপনীয়তা বা সমঝোতার কারণে মামলা চালাতে চান না, যা বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংস্থাগুলোর মধ্যে আস্থাভিত্তিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা খান জানান, ২০২৬ সালের নতুন আইনে মানব পাচারের পাশাপাশি অভিবাসী পাচার ও অনলাইনে ভুয়া চাকরির প্রতারণা সংযুক্ত করা হয়েছে। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা প্রতিরোধই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ) ২০২৬-৩০ প্রণয়ন ও জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা জোরদারের কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা মাঠপর্যায়ের পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। তার মতে, শুধু কেন্দ্রীয় সংস্থা নয়, থানা পুলিশকে আধুনিক প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেই স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধ দমন সম্ভব। পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও তোলে দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে মেটার মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

উইনরক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধি দীপ্তা রক্ষিত হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কম্বোডিয়া থেকে ফেরত আসা ৮০ শতাংশ মানুষ বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ গিয়েও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা প্রচারণা এবং বিকাশ, নগদ, হুন্ডি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো লেনদেন মাধ্যমগুলোর ওপর কঠোর নজরদারির তাগি দেন। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান তথ্য দিয়ে জানান, জুন মাসে কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ১,৮০০ জন প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পায়নি, ৮৮ শতাংশকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল এবং ৬৬ শতাংশ দালালের মাধ্যমে গিয়েছিলেন।

ওকাপের চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম রাষ্ট্রের সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে বলেন, গ্রামের দালাল থেকে শুরু করে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। রামরু’র আইনি সমন্বয়কারী মাহমুদুল হাসান দ্রুত বিচারের অভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং জানান যে ঢাকার মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে পাঁচ মাস ধরে কোনো বিচারক নেই।

ইউনিওডিসির তাসনীম বিনতে করিম বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী আখ্যা দিয়ে আরও প্রশিক্ষণ ও প্রমাণভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার গড়ার উপর জোর দেন। কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত আসা মন্নান ছৈয়াল ও মালয়েশিয়া ফেরত নাজনীন আক্তার প্রতারণা, নির্যাতন ও পাসপোর্ট আটকের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। বর্তমানে মামলার আসামি হওয়া মন্নান জানান, মামলা চালানোর মতো অর্থও তার নেই। বৈঠকটি শেষে মানব পাচারের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনে কঠোর নজরদারিসহ সমন্বিত উদ্যোগের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ পেশ করা হয়।