মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীরা তার কঠোর অর্থনৈতিক নীতির সুবিধাভোগী শেয়ার চিহ্নিত করতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। প্রাথমিকভাবে এই কৌশল লাভজনক হলেও বর্তমানে তা ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। নেড ডেভিস রিসার্চের তৈরি ‘ট্রাম্প ট্রেড ইনডেক্স’ — যা গৃহনির্মাণ, প্রতিরক্ষা খরচ ও শিল্পের পুনঃঅবস্থান থেকে লাভের আশায় গঠিত এক ডজন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) সূচক — বছরের শুরুতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে পেছনে ফেললেও মে মাসের পর থেকে প্রায় ১৬ শতাংশ দর হারিয়েছে। এই সূচকের অন্তর্ভুক্ত একাধিক ইটিএফ এখন বছরের ব্যবধানে নিম্নমুখী অবস্থানে রয়েছে।
নেড ডেভিস রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ট্রেডের এই ভাঙনের মূল কারণ হলো ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত, যা জ্বালানি মূল্য, মুদ্রাস্ফীতির প্রত্যাশা, সুদের হার ও মার্কিন ডলারের মান বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান থিম্যাটিক কৌশলবিদ প্যাট শোসিক বলেন, ‘এই সবকিছুই ইরান যুদ্ধ ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত। আমরা কি তিন মাস কোনো মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা ছাড়া কাটাতে পারি না? শুল্ক, যুদ্ধ বা সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্ন — কোনো না কোনো কারণে কি তিন মাস কোনো সরবরাহ ধাক্কা ছাড়া থাকা সম্ভব নয়?’
এদিকে, বছরের প্রথম তিন মাসে ট্রাম্প ট্রেডের বেশিরভাগ বাজিই দ্বি-অঙ্কের শতাংশ লাভ দেখিয়েছিল। ভ্যানএক রেয়ার আর্থ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক মেটালস ইটিএফ, গ্লোবাল এক্স ইউরেনিয়াম ইটিএফ ও গ্লোবাল এক্স ডিফেন্স টেক ইটিএফ প্রথম প্রান্তিকে অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছিল এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কিছু লাভ ধরে রেখেছিল, কিন্তু পরে সেগুলো লাল দাগে চলে যায়। বিসিএ রিসার্চের প্রধান ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদ ম্যাট গার্টকেনের মতে, ট্রাম্পের এজেন্ডায় বাজি ধরা বিনিয়োগকারীরা এ বছর বেশ কয়েকটি হতাশার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব — যেমন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, যা উৎপাদন ও আবাসন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করেছে — এবং অর্থনৈতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট শেয়ারের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিনিয়োগের থিমের সফলতা উল্লেখযোগ্য। গার্টকেন বলেন, ‘যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ করে প্রথাগত চক্রীয় খাতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে, তারা ভালো করেছে। অন্যদিকে যারা ট্রাম্পকে মার্কিন উৎপাদন, ভারী শিল্প ও শ্রমজীবী মানুষের ভোগের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ফান্ড প্রবাহের তথ্য বলছে, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ ধারাবাহিকভাবে এসব বাজি ছেড়ে দিচ্ছে। ‘ট্রুথ সোশ্যাল গড ব্লেস আমেরিকা ইটিএফ’ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি মাসে অর্থ প্রত্যাহারের মুখে পড়েছে। ‘ওয়াইএএলএল’ টিকার এই তহবিলটি জ্বালানি, শিল্প ও আর্থিক খাতে বেশি এক্সপোজার দেয় এবং এটি এ বছর ৪ শতাংশের বেশি দর হারিয়েছে, যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তহবিলের মালিকানা ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপের (ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের মালিক) শেয়ারে নেই, যা এ বছর বারবার সর্বনিম্ন রেকর্ডে পৌঁছেছে, যদিও জুলাইয়ে কিছুটা পুনরুদ্ধার হয়েছে। শেয়ারটি এখনো বছরে ৩৫ শতাংশ নিচে রয়েছে।
তবে সব ট্রাম্প-সম্পর্কিত ইটিএফই ক্ষতির মুখে পড়েনি। ‘পয়েন্ট ব্রিজ আমেরিকা ফার্স্ট ইটিএফ’, যার টিকার ‘ম্যাগা’, ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় মার্চে সাধারণ মার্কিন শেয়ারবাজারের চেয়ে কম দর হারিয়েছে এবং বছরের ব্যবধানে এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। পয়েন্ট ব্রিজ ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা হাল ল্যাম্বার্ট বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ জ্বালানি মূল্য নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তবে ম্যাগা ইটিএফে প্রচুর জ্বালানি রয়েছে, যা এটিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর কাছাকাছি পারফর্ম করতে সাহায্য করেছে।’
অপর একটি চ্যালেঞ্জ হলো, বিনিয়োগকারীদের পক্ষে হোয়াইট হাউসের নীতিকৌশল ও সেগুলোর বাস্তবায়ন বোঝা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর থেকে শেয়ারবিনিয়োগকারীদের তার অসংখ্য সামাজিক মাধ্যম পোস্ট ও নির্বাহী আদেশ অনুসরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন এবং সেগুলোর সঙ্গে জড়িত সম্ভাব্য লাভ-লোকসানের শেয়ার ধরতে ছুটছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট নিজেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন বা পথ পরিবর্তন করছেন। জোন্সট্রেডিং ইনস্টিটিউশনাল সার্ভিসেসের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইকেল ও’রোর্ক বলেন, ‘সব সময় কিছু না কিছু থাকে — ইরান যুদ্ধ, শুল্ক। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বিনিয়োগকারীরা যতটা সম্ভব এসব নীতি উপেক্ষা করার চেষ্টা করছেন, কারণ তারা আসলে এগুলোকে যুক্তিযুক্তভাবে বিচার করতে পারেন না।’
সবশেষ অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ — মেয়াদোত্তীর্ণ অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ককে ১৯৩০ সালের শুল্ক আইনের ৩৩৮ ধারার অধীনে লক্ষ্যবস্তু পদক্ষেপ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা। এছাড়া ট্রাম্প এই সপ্তাহে কানাডার ওপর বিয়ার, ওয়াইন, কাগজ ও হকি স্টিকসহ বিভিন্ন পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। টিডি কোওয়েনের বিশ্লেষক ক্রিস ক্রুগার ২০ জুলাই এক নোটে জানান, অন্যান্য দেশেও ৩৩৮ ধারার শুল্ক আরোপের আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে চীন ও ইউরোপ পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে।
মুরিয়েল সিবার্টের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা মার্ক মালেক সতর্ক করে বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি ও তেলের মূল্য যখন উচ্চ এবং বিনিয়োগকারীরা কর্পোরেট মার্জিন সম্প্রসারণের গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন, তখন এখনই এসব চাপ দেওয়ার সময় নয়। আমাদের এখন খুব সাবধান হতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজার ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো ঘটনা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা তার মতে একমাত্র ‘জেল থেকে বের হওয়ার কার্ড’ ব্যবহার করেছে।
তবে ট্রাম্পের কিছু কট্টর সমর্থক এখনো বিশ্বাস করেন যে এই কৌশল ছেড়ে দেওয়া ভুল হবে। পয়েন্ট ব্রিজ ক্যাপিটালের ল্যাম্বার্ট, যিনি দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান এবং ট্রাম্পের অভিষেক কমিটির সদস্য ছিলেন, মনে করেন প্রেসিডেন্টের নীতি এখনো শেয়ারবাজারে বিজয়ী তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘এটি দীর্ঘমেয়াদি খেলা। রাতারাতি উৎপাদন সুবিধা তৈরি হয় না।’




