অতীতে ঘরের দেয়াল সাজানোর মানে ছিল শুধু উৎসবের সময় সাদা বা অফ-হোয়াইট রঙের চুনকাম। কিন্তু বিগত এক দশকে নান্দনিকতাবোধ ও জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে ঘর শুধু বাসস্থান নয়, ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের জেরে দেশে গড়ে উঠেছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশাল রঙের বাজার। ২০২০ সালে এই বাজারের আকার ছিল মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকট, কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি এবং উচ্চ শুল্কের কারণে রংশিল্প কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবুও আবাসন খাতের গতি ও মানুষের আধুনিক জীবনধারার ওপর ভর করে শিল্পটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেও আশা জাগাচ্ছে দেশীয় রং।
দেশে রঙের ইতিহাস বেশ পুরোনো। স্বাধীনতার আগে আধুনিক রঙের তেমন প্রচলন ছিল না। দেশের অন্যতম প্রাচীন ব্র্যান্ড এলিট পেইন্টের বর্তমান নাম এ্যাকোয়া পেইন্টস। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শায়ান সিরাজ জানান, ১৯৫২ সালে দেশে রঙের যাত্রা শুরু হয়। তখন মূলত নৌকায় ব্যবহারের জন্য 'আলকাতরা' বিক্রি হতো। সাত দশকের বেশি ঐতিহ্য নিয়ে তারা এখন বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য সরবরাহ করছে। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাজার সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং এটি বছরে ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালে দেশের রং ও প্রলেপের বাজারমূল্য ২২৭ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশে মাথাপিছু রঙের ব্যবহার এখনো ২ কেজির নিচে। অথচ প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কায় এটি ৩ কেজির বেশি এবং আসিয়ান দেশগুলোতে ৭ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, দেশে মানসম্মত রং ব্যবহারের বিশাল সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো হয়নি।
রংশিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি আবাসন খাত। ফ্ল্যাট বা বহুতল ভবন নির্মাণ শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফিনিশিং ও রং। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামালের দাম বাড়ায় ফ্ল্যাট বুকিংয়ে কিছুটা ধীরগতি এলেও নির্মাণাধীন প্রকল্প বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে। নতুন ফ্ল্যাট হস্তান্তর এবং পুরোনো বাড়ি সংস্কারের কারণে রঙের বাজারে মন্দার তেমন প্রভাব পড়েনি। খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, রং বিক্রির ধরন এখন আর শুধু পণ্য বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাধানকেন্দ্রিক সেবায় রূপ নিয়েছে। ক্রেতারা এখন শুধু রঙের টিন কিনে কাজ শেষ করেন না; তারা চান নির্ভরযোগ্য প্রয়োগ ও দীর্ঘস্থায়িত্ব। দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মহসিন হাবিব চৌধুরী বলেন, ক্রেতারা এখন এমন রং চান যা সহজে পরিষ্কার করা যায়, ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং দেয়ালে ফাঙ্গাস পড়তে বাধা দেয়। গ্রাহকদের এই চাহিদা মেটাতে বাজারে এসেছে কম্পিউটারাইজড কালার টিন্টিং মেশিন, যার মাধ্যমে হাজারো শেড থেকে তাৎক্ষণিক রং বেছে নেওয়া যায়। এছাড়াও 'এক্সপেরিয়েন্স জোন', কালার কনসালটেশন সেবা, টেক্সচার পেইন্ট, আর্ট ফিনিশ ও মেটালিক ফিনিশের মতো আধুনিক সমাধান চালু হয়েছে।
পরিবেশ সচেতনতা রঙের বাজারে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে ৬১ শতাংশের বেশি ব্যবহারকারী এখন ওয়াটার-বেজড ও টেকসই রং ব্যবহার করছেন। শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ সিসামুক্ত, লো-ভিওসি, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও গন্ধহীন রং তৈরি করছে। তবে রংশিল্পের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিনির্ভরতা। টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, রেজিন, পিগমেন্ট, সলভেন্ট ও স্পেশাল কেমিক্যালের মতো কাঁচামালের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আনতে হয়। বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সভাপতি মহসিন হাবিব চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট, শিপিং খরচ বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর ওপর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রঙের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা এবং সম্পূরক শুল্কের আওতা বাড়ানোয় প্রস্তুতকারকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চাহিদায় কিছুটা ধীরগতি এলেও শিল্পমালিকেরা নিজেদের লভ্যাংশ কমিয়ে খুচরা বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন।
বাজারে বার্জার ও এশিয়ান পেইন্টসের মতো বহুজাতিক কোম্পানির পাশাপাশি এলিট, এ্যাকোয়া, রেইনবো, রক্সি ও প্যাকটি পেইন্টের মতো দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা মনে করেন, এই খাতের প্রসারের জন্য উৎপাদন খরচ কমাতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন।




