টেসলা ও স্পেসএক্সের উচ্চাভিলাষী নতুন প্রকল্প ‘টেরাফ্যাব’ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। আয়তনের দিক থেকে এই চিপ কারখানাটি বিশ্বের বর্তমান সবচেয়ে বড় স্থাপনাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টেক্সাসের গ্রাইমস কাউন্টিতে নির্মিত হতে যাওয়া এই কারখানার আয়তন প্রায় ৯৩ লাখ বর্গমিটার বা ১০ কোটি বর্গফুটের বেশি হবে বলে জানানো হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে আয়তনের বিচারে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভবনে পরিণত হতে পারে, যা বর্তমানে রাশিয়ার অ্যাভটোভাজ মেইন অ্যাসেম্বলি বিল্ডিংয়ের দখলে রয়েছে। ওই ভবনের আয়তন প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ বর্গফুট।

শুধু আকারেই নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও টেরাফ্যাব হতে চলেছে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী একটি প্রকল্প। একটি কমপ্লেক্সের ভেতরেই উন্নত লজিক ও মেমোরি চিপ তৈরির পাশাপাশি প্যাকেজিং এবং পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই চিপগুলো ব্যবহার করা হবে টেসলার অপটিমাস রোবট, সেলফড্রাইভিং সাইবারক্যাব এবং স্পেসএক্সের মহাকাশভিত্তিক ডেটা সেন্টারের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে। অর্থাৎ, যে ভবনে চিপ তৈরি হবে, সেই চিপই একদিন পৃথিবীর বাইরেও ব্যবহৃত হতে পারে।

চিপের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতেই এমন বিশাল কারখানার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে প্রতিষ্ঠান দুটি। স্পেসএক্সের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠান দুটির সম্মিলিত চিপের প্রয়োজন বৈশ্বিক সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি হবে। তাদের ধারণা, কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা এক টেরাওয়াটের বেশি হতে পারে। তাই বাইরের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের চিপ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় তারা। মাস্কের প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের জন্য এটি নিজস্ব চিপ উৎপাদনের এক বিশাল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রকল্পটির প্রথম ধাপে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে প্রায় ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি ধাপে সম্প্রসারণ হলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। একটি নথিতে ১১৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়েই এই কারখানায় কমপক্ষে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে স্পেসএক্স জানিয়েছে। নিয়োগের বড় অংশই স্থানীয় পর্যায়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

টেরাফ্যাবের উৎপাদিত চিপের সম্ভাব্য ব্যবহারই এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। এখানে তৈরি প্রসেসর দিয়ে চলবে টেসলার অপটিমাস রোবট ও সাইবারক্যাব। অন্যদিকে, মহাকাশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনায় সেগুলো পরিচালনার জন্যও বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন হবে। টেরাফ্যাবের উচ্চক্ষমতার চিপ সেই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে একটি কারখানার সাথেই জড়িয়ে যাচ্ছে রোবট, স্বচালিত গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি — মাস্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রায় সব ক্ষেত্রই।

এত বড় কারখানার শিল্পকার্যক্রম চালাতে প্রয়োজন হবে বিপুল পানি। সেই চাহিদা মেটাতে টেক্সাসের গিবনস ক্রিক রিজার্ভয়ারের পানি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রাইমস কাউন্টির অবস্থানটি টেসলা ও স্পেসএক্সের টেক্সাসভিত্তিক অন্যান্য কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বৃহত্তর প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে। স্টারবেস, বাসট্রপ ও ম্যাকগ্রেগরের পাশাপাশি টেরাফ্যাব যুক্ত হলে অঙ্গরাজ্যটিতে মাস্কের প্রযুক্তি ও উৎপাদন অবকাঠামোর উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হবে।

শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিপ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করাই লক্ষ্য নয়; মাস্কের বৃহত্তর পরিকল্পনায় এমন এক ভবিষ্যৎ দেখা যায়, যেখানে মানুষ পৃথিবীর বাইরেও আরও বড় স্থাপনা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নামবে। সেই ভবিষ্যতের সূচনা হতে পারে টেক্সাসের এই বিশাল ভবন দিয়ে। এক ছাদের নিচে তৈরি হবে কোটি কোটি ডলারের প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শক্তি এবং মহাকাশযুগের নতুন সম্ভাবনা।