রাজবাড়ী জেলার প্রধান ডাকঘরে এক ‘লেটার রাইটার’ গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পলাতক হয়েছেন। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী গ্রাহকেরা অর্থ ফেরতের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ডাকঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। অভিযুক্ত শিহাব মৃধা রাজবাড়ী সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের বাসিন্দা। লেটার রাইটার পদটি সরকারি রাজস্বভুক্ত নয়; কাজের সুবিধার্থে কিছু ডাকঘরে অস্থায়ী ভিত্তিতে এই পদে লোক নিযুক্ত করা হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, মেয়াদি সঞ্চয় হিসাব খোলার জন্য ডাকঘরে গেলে কর্মকর্তারা তাঁদের শিহাব মৃধার কাছে পাঠাতেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে স্লিপের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে সঞ্চয় বই পরে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন। এভাবে ৬০ জনের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করে তিনি উধাও হয়ে যান।

ভুক্তভোগী নাসরিন আক্তার জানান, অনেক কষ্টে জমানো দুই লাখ টাকা জমা দিতে গিয়ে সাদা কাগজের স্লিপ পেয়েছিলেন। কয়েকদিন পর আসতে বলা হয়েছিল, কিন্তু পরে জানতে পারেন টাকা জমাই হয়নি। একই অবস্থা খোকন শেখের, যিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ডাকঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, স্ত্রীর নামে দুই লাখ টাকা জমা দিতে গিয়ে শিহাবের কাছে পাঠানো হয়। পরে বারবার এসেও বই না পাওয়ায় এখন বুঝতে পেরেছেন টাকাই জমা হয়নি।

শহরের রেলগেট এলাকার চা–দোকানি প্রণব সাহা গত ৬ মে এক লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য জমা দেন। তাঁকে বলা হয় সার্ভার সমস্যার কারণে তাৎক্ষণিক মেসেজ যাবে না। শিহাব তাঁকে একটি স্লিপ ধরিয়ে দিলেও আর কোনো মেসেজ আসেনি।

এ ঘটনায় ইতিমধ্যে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত ১৬ জুলাইয়ের আদেশে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। এতে খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সভাপতি, খুলনা সার্কেল অফিসের সুপারিনটেনডেন্টকে (তদন্ত) সদস্যসচিব এবং খুলনা ও কুষ্টিয়া বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলকে সদস্য করা হয়। অপর কমিটি গঠন করেছে কুষ্টিয়া বিভাগীয় কার্যালয়। কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসক) মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, দায়িত্বরত কর্মকর্তারা দায় এড়াতে পারেন না। প্রায় ৬০ গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্তের পাশাপাশি টাকা উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বৃদ্ধ সনৎ বিশ্বাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গায়ের রক্ত জল করে দুই লাখ টাকা জমিয়েছিলেন, যা এখন আর নেই। চোখে শুধু অন্ধকার দেখছেন। শিহাব মৃধার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একতলা পাকা ঘর। তাঁর স্ত্রী ও ছোট ভাই ছাড়া কেউ নেই। শিহাবের ছোট ভাই মাহবুব মৃধা জানান, এক সপ্তাহ আগে অফিসে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে আর ফেরেননি। অভিযুক্তের মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ।

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ জানান, এখন পর্যন্ত ৬০ জনের বেশি গ্রাহক এসেছেন, ফলে কোটি টাকার মতো আত্মসাৎ হয়েছে বলে ধারণা। ১৩ জুলাই কুষ্টিয়া থেকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা এলে শিহাব মৃধা কৌশলে পালিয়ে যান। এদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজবাড়ী জেলা শাখা সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের আইনের আওতায় আনা ও ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।