স্পেনের ফুটবলের সাফল্যের গোপন রহস্য উন্মোচন করেছে লা লিগা। ঘাসবিহীন ছোট মাঠ থেকে শুরু করে কাদামাটি ভরা মাঠ—স্পেনের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা হাজারো খেলার মাঠে যে তরুণ প্রতিভারা গড়ে ওঠেন, তাঁরাই একদিন দেশকে এনে দেন বিশ্বজয়। সম্প্রতি লা লিগার ফুটবল প্রজেক্টস বিভাগ প্রকাশ করেছে এক বিস্তারিত গবেষণাপত্র, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে—গত এক দশকে স্প্যানিশ ফুটবলের সাফল্য এবং ক্লাব পর্যায়ের একাডেমি বিনিয়োগের সম্পর্ক কতটা গভীর।

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি গত দশকে পুরুষ, নারী ও যুব দলের মিলিত সাফল্যকে ভিত্তি করে তৈরি এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ইউরোপের সবচেয়ে সফল জাতীয় দল এখন স্পেন। সিনিয়র ও যুব পর্যায়ে পুরুষ ও নারী দল মিলিয়ে মোট ২৩টি শিরোপা জিতেছে দেশটি। সংখ্যাটা যেন বিস্ময়কর—দ্বিতীয় স্থানে থাকা জার্মানির শিরোপা ৯টি, ইংল্যান্ড ৭টি, ফ্রান্স ও পর্তুগাল সমান ৬টি করে, নেদারল্যান্ডস ৫টি এবং ইতালি ৪টি।

জাতীয় দলের এই সাফল্যের সঙ্গে ক্লাবগুলোর কাজের সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে গবেষণায়। বিশেষ করে লা লিগা ও এর নিচের স্তরের ক্লাবগুলো তাদের একাডেমিতে যেভাবে বিনিয়োগ করেছে, তা ২০১৬ সালের পর থেকে আরও গতি পেয়েছে। ক্লাব, ফেডারেশন এবং লিগ মিলে তৈরি করেছে এক সম্মিলিত পরিকল্পনা, যার অংশ হিসেবে ২০২২ সালে চালু হয়েছে জাতীয় একাডেমি উন্নয়ন পরিকল্পনা।

লা লিগার ফুটবল প্রজেক্টস বিভাগের প্রধান হুয়ান ফ্লোরিত বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তরুণদের গড়ে তোলা শুধু মাঠেই ফল দেয় না, অর্থনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্লাবগুলোর সঙ্গে কাজ করে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া হয়, একাডেমির মান বাড়ানো হয়, তবে প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব দর্শন অটুট রাখা হয়।

এই কৌশলেরই বাস্তব প্রমাণ ২০২৬ বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দল। বিশ্বকাপের জন্য ডাকা ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৫ জনই শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে একাডেমি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছেন। তাঁদের তৈরি করতে লা লিগার ১১টি ক্লাব সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ এই সাফল্য কোনো একক একাডেমির কীর্তি নয়, বরং একটি বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময় ও পরস্পরসংযুক্ত পুরো ব্যবস্থার ফসল।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিশ্বজয়ী এই খেলোয়াড়দের অনেকেই নিজ ক্লাব ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন, যা স্পেনকে এনে দিয়েছে ৪৬ কোটি ৬০ লাখ ইউরোরও বেশি। অন্যদিকে ৯ জন খেলোয়াড় এখনো নিজ ক্লাবেই আছেন, যাঁদের বাজারমূল্য প্রায় ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো।

২০২৫-২৬ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে একাডেমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের খেলানোর সময়ের হিসেবে শীর্ষে লা লিগা—মোট খেলার সময়ের ২০.১ শতাংশ। এই তালিকায় ফ্রান্স ১৬.১, জার্মানি ১১.৯, ইংল্যান্ড ৮.৩ ও ইতালি ৭.৬ শতাংশ নিয়ে পিছিয়ে আছে। একাডেমি স্নাতকদের সুযোগ দেওয়ার দিক থেকে ২০২৫-২৬ মৌসুমে শীর্ষে অ্যাথলেতিক বিলবাও (৬৯.৫% মিনিট), এরপর রিয়াল সোসিয়েদাদ (৫৫.২%), বার্সেলোনা (৪৭.৫%), সেল্তা ভিগো (৪৩.১%), ওসাসুনা (২৬.১%) ও সেভিয়া (২৫.০%)। ভ্যালেন্সিয়া ২৩.৮% ও রিয়াল মাদ্রিদ ২৩.১% নিয়ে তাদের ঠিক পরেই অবস্থান করছে।

দ্বিতীয় বিভাগেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। রেসিং ক্লাব, দেপোর্তিভো লা করুনিয়া ও মালাগা—এই তিন দল প্রথম বিভাগে উঠে এসেছে নিজেদের একাডেমির খেলোয়াড়দের ওপর ভরসা করেই। মালাগা ৫৭.৩ শতাংশ সময় দিয়েছে তাঁদের, রেসিং ২১.৪ ও দেপোর্তিভো ১৭.৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি একাডেমি স্নাতকও এসব দলেই—মালাগায় ১১ জন, রেসিংয়ে ৯ জন এবং দেপোর্তিভোয় ৬ জন।

গবেষণায় স্প্যানিশ একাডেমি ব্যবস্থার আরেকটি বিশেষ দিক উঠে এসেছে—তরুণ খেলোয়াড়দের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। ২০২৪ ইউরো জেতা দল ও ২০২৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট। ইউরোতে স্পেন খেলেছে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবল, আর বিশ্বকাপে তারা নির্ভর করেছে বল দখলে রাখার সমষ্টিগত ফুটবলের ওপর। কিন্তু খেলোয়াড়েরা একই—শুধু তাঁরা বদলে গেছেন, মানিয়ে নিয়েছেন। এই মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং এ কারণেই স্প্যানিশ একাডেমির উঠে আসা খেলোয়াড়দের বলা হয় ‘সম্পূর্ণ খেলোয়াড়’।

নিজের দেশের ফুটবলের চিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি এই মডেল বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে লা লিগা। ইরাক, চীন, ভিয়েতনাম ও পেরুর মতো দেশের ক্লাব, ফেডারেশন ও লিগের সঙ্গে কাজ করছে তারা। কোথাও তৈরি হচ্ছে নতুন একাডেমি, কোথাও চলছে কোচদের প্রশিক্ষণ। প্রতিভা লালনের এই স্প্যানিশ মডেল এখন বিশ্ব ফুটবলে অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।