প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কক্সবাজারের কোনো হোটেলের ‘প্রাইভেট বিচ’ শুনে আমরা যেমন সহজেই মেনে নিই যে সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতে সাধারণত আমরা বুঝি সেখানে অন্যের প্রবেশের অনুমতি নেই। ছোটবেলা থেকে এই ধারণাতেই বড় হয়েছেন সুইডেনে কর্মরত বাংলাদেশি পুষ্টিবিজ্ঞানী মুকুল হোসেন। কারও জমির ওপর দিয়ে হাঁটা, পুকুরে মাছ ধরা বা গাছের ফল তোলা—এসবই তাঁর কাছে ছিল অপরের অনুমতিসাপেক্ষ বিষয়।

সুইডেনে আসার পরও দীর্ঘদিন তাঁর ধারণা ছিল, রাস্তার পাশে চোখে পড়া বিশাল বন বা হ্রদগুলো সরকারি সম্পত্তি। কিন্তু একদিন সহকর্মীদের সঙ্গে প্রকৃতি ও গ্রীষ্মের ছুটি নিয়ে আলাপকালে তিনি জানতে পারেন এমন এক তথ্য, যা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। তাঁরা জানান, চাইলে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বনের ভেতরেও হাঁটা যায়, সেখানে বুনো বেরি বা মাশরুম সংগ্রহ করা যায় এবং বাড়ি থেকে যথেষ্ট দূরে উপযুক্ত জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোও সম্ভব। জমির মালিকের কাছ থেকে এর জন্য আগে অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা কারও কাছে এতটাই অস্বাভাবিক এই নিয়ম যে, লেখক নিজেও প্রথমে সহকর্মীদের কথা সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এটি সুইডেনে বহুদিন ধরে চলে আসা ‘আলেমানসরেত্তেন’ (Allemansrätten) নামে পরিচিত বিশেষ এক অধিকার। বাংলায় যার সহজ অর্থ ‘প্রকৃতিতে সবার প্রবেশাধিকার’। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, সুইডেনের বিশাল বনভূমির বড় অংশই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। ফলে বনে হাঁটতে গিয়ে যে জমির ওপর দিয়ে যাওয়া হয়, সেটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তারপরও প্রকৃতির সেই দরজা সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ থাকে না।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, অন্যের সম্পত্তিতে যা খুশি করা যাবে। কারও বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ বা বাসিন্দাদের গোপনীয়তা নষ্ট হয় এমন দূরত্বে যাওয়া নিষিদ্ধ। চাষের জমির ক্ষতি করা, গাছ কাটা বা ডাল ভাঙা, নিরাপদ নয় এমন স্থানে আগুন জ্বালানো—এসব কিছুই করা যাবে না। মূল নীতি হলো, নিজের উপস্থিতির কারণে জমির মালিক, অন্য মানুষ বা প্রকৃতির কোনো ক্ষতি করা যাবে না। এই বিশাল স্বাধীনতাকে সুইডিশরা ছোট্ট একটি বাক্যে প্রকাশ করে — “Inte störa - inte förstöra”, যার অর্থ “বিরক্ত কোরো না, ক্ষতি কোরো না”।

আলেমানসরেত্তেন শুধু বনে হাঁটার অধিকারই নয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সুইডিশ সমাজের গভীর দর্শন। সেখানে মালিকানা ও প্রকৃতিকে উপভোগ করার অধিকারকে সব সময় একই বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। জমির মালিকানা কারও থাকতে পারে, কিন্তু তার জমির বিস্তীর্ণ বনের মধ্য দিয়ে অন্য কেউ হেঁটে গেলে, বুনো বেরি তুলে নিলে বা প্রকৃতির ক্ষতি না করে কিছু সময় কাটালে তাকে বাধা দেওয়ার অধিকার মালিকের নেই। বাংলাদেশের মতো সমাজে, যেখানে নিজের ও অন্যের সীমানা খুব স্পষ্ট — বাড়ির সীমানা, জমির আল, পুকুরের মালিকানা — সেখানে প্রকৃতিকে দেখার এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অভিবাসী একজন মানুষের কাছে চিরকালের জন্য বিস্ময়কর হয়ে থাকবে। জমির মালিক একক হতে পারেন, কিন্তু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত বলেই এই রীতির অন্তর্নিহিত বার্তা।