রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর দনিয়া-দোলাইরপাড় রোডের ‘আওয়ার গ্রিন ভ্যালি’ নামের বাসাটি সত্যিই এক সবুজ নন্দনকানন। ছয়তলা ভবনের ছাদ জুড়ে গড়ে উঠেছে নানা ফল, ফুল আর সবজির সমাহার। জহিরুল ইসলাম কবির ও ডালিয়া কবির দম্পতির হাত ধরে এই ছাদে ফুটে উঠেছে ড্রাগন ফলের সম্ভারও, যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করেন উৎসুক মানুষজন।

বর্ষার একদিন সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের ছাদের মাঝখানে নিজেদের ব্যবহারের জায়গা রেখে চারপাশ ঘিরে স্থায়ী সবজির বেড তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে লতানো সবজির মাচা উঠে গেছে সিঁড়িঘরের ছাদ পর্যন্ত। ধুন্দুল, চিচিঙ্গা, উচ্ছে, করলা, শসা, চালকুমড়া, আঙুর, প্যাশন ফ্রুটসহ নানা লতানো সবজির দেখা মেলে এই মাচায়। শীত এলে যোগ হয় লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটির মতো শাকসবজি। মৌসুম ভেদে বদলে যায় সবজির ধরন। ফলন শেষে লতা কেটে দিলেই মাচা আবার নতুন চারার জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

শুধু সবজি নয়, এই ছাদে জায়গা পেয়েছে আম্রপালি, সূর্য ডিম, আমেরিকান রেড পালমার, বারি ফোর, ব্ল্যাক স্টোনসহ ১২ রকমের আম। পেঁপে, মিষ্টি তেঁতুল, মালবেরি, জামরুল, আপেল, কমলা, করমচা, গোলাপজাম, লুকলুকি, পারসিমন, আলুবোখারা, বরই, আনারসসহ নানা ফলের গাছও রয়েছে। প্রায় ২০০ রকমের ফুলের মধ্যে কাঠগোলাপ, রেইনলিলি, ক্রিনাম লিলি, ব্যাটলিলি, নাইট কুইন, হাসনাহেনা, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, করবী, চন্দ্রপ্রভা, কদম, শাপলা, পদ্ম অন্যতম।

মূল ছাদ থেকে লোহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে চোখে পড়ে বারোমাসি আমড়া, জাম্বুরা, চেরি ফল, পেয়ারা, আতা, মেহেদি, সফেদা, কলাসহ আরও নানা গাছ। তবে ড্রাগন ফলের আসল রাজ্য দেখতে হলে আরেকটি মই বেয়ে উঠতে হবে পানির ট্যাংকের ছাদে। সিঁড়িঘরের ছাদ থেকে ৪ ফুট উঁচুতে ২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের এই ট্যাংকের ওপরই গড়ে উঠেছে ড্রাগন ফলের বাগান। মাঝের অংশে কলমি শাকের চাদর আর চারপাশে ঘন সারি সারি ড্রাগন ফলের গাছ। পাতাহীন কাঁটাযুক্ত সবুজ কাণ্ডে ঝুলছে লাল ও হলুদ রঙের ফল। কোথাও কাঁচা সবুজ ফল, কোথাও বা নতুন ফুলের কলি।

২০২১ সালে মাত্র অল্পসংখ্যক গাছ দিয়ে ড্রাগন ফলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে ক্যাকটাসজাতীয় কাঁটাযুক্ত গাছ হওয়ায় ছাদে চলাফেরায় সমস্যা হচ্ছিল, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। তাই ২০২৩ সালে সাত হাজার টাকা খরচ করে নাটোর থেকে ১৫০টি চারা এনে পানির ট্যাংকের ওপরে সরিয়ে নেওয়া হয়। পিভিসি পাইপ, রড, সিমেন্ট আর জিআই তার দিয়ে নিজেই মাচা তৈরি করেন জহিরুল ইসলাম। রাতের বেলা ফুলের পরাগায়নের জন্য বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।

রাতের বেলা ড্রাগন ফুল ফোটে এবং এ সময় পরাগায়নের মতো পোকামাকড় তেমন থাকে না। তাই সর্বোচ্চ ফলন পেতে হাত দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হয়। সন্ধ্যার পর ফুল ফুটতে শুরু করে এবং রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে পরাগায়ন করা হয়। প্রথমে ব্রাশ দিয়ে সব ফুলের পরাগরেণু সংগ্রহ করে তারপর সেই রেণু প্রতিটি ফুলের গর্ভমুণ্ডে প্রয়োগ করা হয়। এতে ফলনের পাশাপাশি ফলের আকারও ভালো হয় বলে জানান ডালিয়া কবির।

ফল পাকলে সবুজ থেকে লাল বা হলুদ রং ধারণ করে, তবে রং এলেই সংগ্রহ করা ঠিক নয়। কমপক্ষে পাঁচ দিন গাছে রেখে পরিপক্বভাবে পাকতে দিলে ফলের মিষ্টতা বাড়ে। পাকা শুরু হলেই পাখিরা ফল নষ্ট করতে শুরু করে, তাই ব্যাগিং করে ফল রক্ষা করা হয়। তবে হাতের নাগালের বাইরের বেশির ভাগ ফল পাখিদের পেটেই যায়। জহিরুল ইসলাম জানান, বছরে এই ট্যাংকের ছাদ থেকেই প্রায় দুই থেকে তিন মণ ড্রাগন ফল পাওয়া যায়। কোনো বিক্রির উদ্দেশ্য নয়, পুরোটাই পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে খরচ হয়। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এমনকি বাড়ির ভাড়াটেদের সঙ্গেও শেয়ার করা হয় এই ফল।

নতুন যারা ছাদে ড্রাগন ফল করতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ হলো ভালো মানের চারা সংগ্রহ করা। রোপণের প্রথম বছর কোনো শাখা না রেখে গাছকে বাড়তে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে ঝোপমতো হতে দেওয়া। ফুল এলে কৃত্রিম পরাগায়ন করলে ফলন ও আকার দুটোই ভালো হয়। জৈব সার ও খৈল পচা পানি নিয়মিত দিলেই গাছ ভালো থাকে।