যশোরের সদর, শার্শা ও মনিরামপুর উপজেলায় চারটি নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর উচ্চতা সরকারি নির্ধারিত মাপের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গেজেট অনুযায়ী, পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে সেতুর গার্ডারের উচ্চতা অন্তত ১৫ ফুট হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে নির্মাণাধীন এই সেতুগুলোতে এই ব্যবধান কোথাও ৬ ফুট আবার কোথাও ৮ ফুটে নেমে এসেছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পগুলো শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী সেতু নির্মাণের আগে বিআইডব্লিউটিএ-র ছাড়পত্র নেওয়া প্রয়োজন থাকলেও এলজিইডি তা করেনি। বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ এলজিইডি-কে একাধিকবার চিঠি দিলেও তারা তা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং বিষয়টি আদালতে গড়ায়। ২০২৪ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মাণকাজের নির্দেশ দিলে দীর্ঘ দুই বছর ধরে কাজ বন্ধ হয়ে আছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আটটি সেতুর মধ্যে একটির কাজ প্রায় শেষ, পাঁচটির অগ্রগতি ৮০-৯৫ শতাংশ এবং বাকি দুটির কাজ যথাক্রমে ৬০ ও ৩২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থাতেই পাঁচটির প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এই সেতুগুলো কি ভেঙে ফেলা হবে নাকি বর্তমান নকশায় শেষ হবে? ভেঙে ফেললে ৪১ কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ নষ্ট হবে, আবার বর্তমান নকশায় শেষ করলে নৌপথ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভৈরব নদের ওপর তিনটি, বেতনা নদীতে দুটি, শ্রী নদে একটি এবং মুক্তেশ্বরী নদীতে দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে এসব নদীতে নৌযান চলাচল নেই, তবে কয়েক দশক আগে ট্রলার ও নৌকা চলাচল করত। তবে মনিরামপুরের মুক্তেশ্বরী নদীতে এখনো জোয়ার-ভাটা হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষ নিজেদের উদ্যোগে সংযোগ সড়ক তৈরি করে কিছু সেতু ব্যবহার করছেন, আবার কোথাও পণ্য পরিবহনের জন্য অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে কৃষকদের।

দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে এলজিইডির কর্মকর্তাদের মধ্যে। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান জানান, নকশা বিভাগ এই পরিকল্পনা করেছিল এবং তিনি তখন দায়িত্বে ছিলেন না। অন্যদিকে, পূর্বতন নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে বিআইডব্লিউটিএ-র অনুমোদন নেওয়া হয়নি, কারণ এতে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বেড়ে যেত। এলজিইডির সেতু ডিজাইন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এম এ ছাত্তার জানান, এখন কাজ শুরু করলে আদালত অবমাননার ঝুঁকি থাকে, তাই মামলা প্রত্যাহারের চেষ্টা চলছে। তবে তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ রক্ষা করতে এই সেতুগুলো শেষ করা ছাড়া উপায় নেই।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, সেতুর পিলারের উচ্চতা বাড়িয়ে এবং গার্ডার পুনরায় বসিয়ে নকশা সংশোধনের কাজ চলছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ খুলনার উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ জানিয়েছেন, শেষ আড়াই বছরে এলজিইডির পক্ষ থেকে কোনো ছাড়পত্রের আবেদন আসেনি। পুরো বিষয়টি এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি জেলা প্রশাসক এবং এলজিইডির সাথে আলোচনা করেছেন। সম্পদের অপচয় রোধ এবং জনদুর্ভোগ কমাতে মামলার বাদীর সাথে কথা বলে আইনি জটিলতা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে দ্রুত কাজ শেষ করা যায়।