বর্তমানে বাংলাদেশের সবকটি অর্থাৎ ৬৪টি জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিদ্যমান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের পিরোজপুর জেলায় সংক্রমণের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহে ঢাকা, ময়মনসিংহ, বান্দরবান, পিরোজপুর, খুলনা এবং ঝালকাঠি—এই ছয়টি জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত পিরোজপুর জেলায় ১ হাজার ১৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন এবং ৭৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উল্লেখ্য, গত বছরের একই সময়ে এই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে নতুন ৮০৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট ২৩ হাজার ৯৭৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৭৪৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে (৯ হাজার ৫৩৯ জন)। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৪ হাজার ৩৫৯ জন, চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৯২২ জন, খুলনায় ৩ হাজার ১৭৯ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ১১১ জন, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৭ জন এবং রংপুরে ৬৬৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩৩ জন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, শয্যার স্বল্পতার কারণে মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে। তথ্যানুসারে, মে মাসে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন, যা জুনে বেড়ে হয় ২ হাজার ৯০৭ জন এবং জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জনে পৌঁছায়। আগস্টের প্রথম ১৬ দিনে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬৬৮ জনে। তবে গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক সংক্রমণ কিছুটা কম। গত বছর ১৬ আগস্ট পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ছিলেন ২৫ হাজার ৯১২ জন এবং ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর ব্যাপক প্রকোপ দেখা গিয়েছিল, যেখানে ৯ হাজার ৫৩৪ জন আক্রান্ত এবং ১৫ জন মারা গিয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণাঞ্চলে এই রোগের বিস্তার বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বরগুনায় ব্যাপক প্রচার এবং জেলা প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের মশা নিধনে সক্রিয় উদ্যোগের কারণে এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে পিরোজপুরে তেমন কোনো জোরালো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং শহরের অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকায় মশার বংশবৃদ্ধি সহজ হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ এবং আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশতাক হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, পিরোজপুরে মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একইসাথে তিনি দেশব্যাপী সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন, অন্যথায় আগামী বছর অন্য কোনো জেলায় এই সমস্যা প্রকট হয়ে উঠতে পারে।




