চিভনিং বৃত্তির ব্রিটিশ সমন্বয়কারী বলেছিলেন, ‘হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল।’ কারণ, এই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তির সুযোগ হাতছাড়া করছিলেন খন্দকার মাইনুল ইসলাম। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন তাঁর পথ সম্পর্কে, তাই ইরাসমাস মুন্ডুসের ড্রিম প্রোগ্রাম বেছে নেন ইউরোপে উচ্চশিক্ষার জন্য।
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নকালে তাঁর চিন্তা শুধু সনদ অর্জনে সীমিত ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের বুনিয়াদ তৈরির স্থান ভাবতেন তিনি। এই দর্শন থেকেই আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ ও রোবোটিকস ক্রুর মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যুক্ত হন, দেশ-বিদেশের প্রতিযোগিতা ও কর্মশালায় অংশ নেন। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন, শ্রেণিকক্ষের জ্ঞানের বাইরে নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও দলগত কাজের দক্ষতা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় বর্ষে আইইইই শাখার ভাইস চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর দিগন্ত আরও প্রসারিত করে। এআইইউবি আয়োজিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইরাসমাস+রোডশোতেই তিনি প্রথম প্রোগ্রামটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। ২০২৩-২৪ সালে শাখার চেয়ারপারসন থাকার সময় টেকসই জ্বালানি বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেন এবং ৫৬টি সেমিনার, ওয়েবিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করেন, যা তাঁর নেতৃত্ব ও সাঙঠনিক দক্ষতা দৃঢ় করে। এই সময়কালে তাঁর সাতটি গবেষণাপত্রও প্রকাশিত হয়।
২০২৪ সালে মেধা তালিকায় শীর্ষে থেকে স্বর্ণপদকসহ স্নাতক সম্পন্ন করে দেশের একটি বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিতে যোগ দেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে গবেষণার প্রতি অদম্য টান অনুভব করায় এই ভালো চাকরিটি ছেড়ে দেওয়ার দুঃসাহসি সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের অনেকেই এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলেও, মায়ের উৎসাহ— ‘তুমি আরও বড় কিছু করার জন্য জন্মেছ, চেষ্টা করো’—তাঁকে অদম্য শক্তি জোগায়। এরপর তিনি আইইএলটিএস, বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন ও বৃত্তির প্রস্তুতিতে মনোনিবেশ করেন।
প্রথমে চিভনিং স্কলারশিপে আবেদন করেন, যার আবেদন প্রক্রিয়া তাঁকে শিখিয়েছিল দূরদর্শী ভাবতে। একাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেই সেখানে বড় করে দেখা হয়। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম, ইয়র্ক ও অক্সফোর্ডে আবেদন করেন এবং একপর্যায়ে ব্রিটিশ হাইকমিশনে ৪৫ মিনিটের সাক্ষাৎকার শেষে নিজের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পান।
তিনি মোট চারটি ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামে আবেদন করে সবকটিতেই নির্বাচিত হন। শেষ পর্যন্ত বেছে নেন ‘ড্রিম’ নামে পরিচিত ইউরোপিয়ান মাস্টার ইন ডায়নামিকস অব রিনিউয়েবলস-বেজ্ড পাওয়ার সিস্টেমস প্রোগ্রাম। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি ছিল কঠোর একাডেমিক ও প্রযুক্তিমুখী, যেখানে প্রকল্প উপস্থাপনা ও দীর্ঘ টেকনিক্যাল সাক্ষাৎকারে উত্তীর্ণ হতে হয়। সাক্ষাৎকারটি ছিল রোজার ঈদের দিন। ঘরে আমন্ত্রিতরা উৎসবে মশগুল থাকলেও তিনি একটি ছোট ঘরে কম্পিউটারের সামনে কাটিয়েছিলেন, আর তাকে করা নয়টি প্রশ্নই ছিল পুরোপুরি টেকনিক্যাল।
অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত ই-মেইল আসে পয়লা বৈশাখের দিন, যখন তিনি বন্ধুদের সঙ্গে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তির জন্য মনোনীত হওয়ার খবর পাওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকেন। এরপর দৌড়ে গিয়ে মাকে জানালে, মায়ের অনুভবের আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই ঘটনাকে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্মরণীয় মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন।



