যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর একদল গবেষক সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, মাত্র ৬০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজের জরুরি কম্পিউটার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বিশেষ কয়েন আকৃতির যন্ত্র ব্যবহার করে উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে। তবে এ জন্য উড়োজাহাজের একটি নির্দিষ্ট অংশে অল্প সময়ের জন্য প্রবেশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

বিমানবন্দরের গেটে বা হ্যাঙ্গারে রাখা অবস্থায় একটি বোয়িং ৭৩৭-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই ধরনের হামলা চালানো সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের লক্ষ্য যাত্রীদের আতঙ্কিত করা নয়, বরং উড়োজাহাজের সম্ভাব্য নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করে তা মোকাবিলায় আগেভাগে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। গবেষণায় উড়োজাহাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থাকে হ্যাক করার পদ্ধতি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

গবেষক অ্যারন শুলম্যান জানিয়েছেন, বিমান চলাচল খাতকে এ ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক করাই এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। ঝুঁকিগুলো গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যায় রূপ নেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। বোয়িং ৭৩৭ নিয়ে গবেষণার সময় উড়োজাহাজটির ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট (ইঅ্যান্ডই) বেতে একটি অব্যবহৃত রক্ষণাবেক্ষণ পোর্টের সন্ধান পান গবেষকরা। উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম এই অংশে রাখা থাকে।

উড়োজাহাজের সামনের নিচের দিকে অবস্থিত ইঅ্যান্ডই বেতে মাটি থেকেই পৌঁছানো সম্ভব বলে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ। সেখানে থাকা পোর্টটি তালাবদ্ধ নয়, ফলে কেউ অল্প সময়ের জন্য ওই অংশে প্রবেশের সুযোগ পেলে পোর্টটির সঙ্গে একটি বিশেষ যন্ত্র যুক্ত করতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই পোর্টে যন্ত্র যুক্ত করে ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। এভাবেই উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার ব্যবস্থায় অননুমোদিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ওই পোর্টের যোগাযোগব্যবস্থায় এআরআইএনসি ৪২৯ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। কয়েক দশক ধরে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত এই প্রযুক্তিতে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনেক সুবিধা নেই। ফলে এর মাধ্যমে আদান-প্রদান হওয়া তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। পরীক্ষার সময় বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে উড়োজাহাজের কম্পিউটারগুলোর মধ্যে চলা যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজের গতিপথ সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি ওজন, ভারসাম্য ও তাপমাত্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

এসব তথ্য ভুলভাবে পরিবর্তিত হলে উড্ডয়ন ও উড়োজাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের হস্তক্ষেপ সব সময় পাইলটের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে ধরা না-ও পড়তে পারে। শুলম্যান বলেন, এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে পাইলটের অজান্তেই উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই উড়োজাহাজে অল্প সময়ের শারীরিক প্রবেশাধিকারকেও সাইবার নিরাপত্তার দৃষ্টিতে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত যাত্রীবাহী উড়োজাহাজগুলোর একটি হওয়ায় গবেষকরা বোয়িং ৭৩৭ মডেলকে পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছেন। তবে গবেষণার ফল প্রকাশের পর যাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলেও জানিয়েছেন তাঁরা। গবেষণায় ব্যবহৃত বিশেষ যন্ত্রটি নিরাপদে রাখা হয়েছে। শুলম্যান বলেন, গবেষণাটির সব লেখকই নিয়মিত বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন এবং ভবিষ্যতেও এই মডেলের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। সূত্র: ডেইলি মেইল।