বিজ্ঞানীদের একাংশ এখন একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করছেন—কীভাবে একটি ক্ষুদ্র মহাকাশযান সরাসরি একটি কৃষ্ণগহ্বরের অত্যন্ত নিকটবর্তী স্থানে পাঠানো যেতে পারে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ও চরম বস্তু হিসেবে পরিচিত ব্ল্যাকহোলের অভিকর্ষীয় ক্ষেত্র এতই শক্তিশালী যে, এর মাধ্যমে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে অন্য কোনো জ্যোতিষ্কের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে যাচাই করা সম্ভব। তবে হাজার হাজার আলোকবর্ষ দূর থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে, আমরা ইতিমধ্যেই সেই সীমার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের সাংহাই শহরে অবস্থিত ফুদান ইউনিভার্সিটির গবেষক কাসিমো বাম্বি একটি নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যা arXiv-এ প্রি-প্রিন্ট হিসেবে উপলব্ধ। তাঁর গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, আমাদের নিকটবর্তী কোনো ব্ল্যাকহোলে মাত্র এক গ্রাম ওজনের একটি প্রোব পাঠানোর জন্য কী ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রকৌশলগত প্রস্তুতির প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমানে মানুষের জানা সবচেয়ে কাছের কৃষ্ণগহ্বরটির নাম ‘গায়া বিএইচ১’। ওফিউকাস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত এই বস্তুটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৫৬০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। মজার বিষয় হলো, আমরা এটিকে সরাসরি দেখতে পাইনি; বরং এর পাশে থাকা একটি সঙ্গী নক্ষত্রের ওপর সৃষ্ট মহাকর্ষীয় প্রভাব পর্যবেক্ষণ করেই এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাম্বির গবেষণাপত্র অনুসারে, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০ কোটি নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল বিদ্যমান। এদের মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই একেবারে নিঃসঙ্গ—অর্থাৎ কোনো সঙ্গী নক্ষত্র নেই যারা আলোর মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি জানাবে। পরিসংখ্যানগত হিসাব বলছে, প্রতি ১ হাজার ৫০০ ঘনক পারসেক (প্রায় ৫২ হাজার ঘনক আলোকবর্ষ) এলাকায় অন্তত একটি নক্ষত্র-ভরের ব্ল্যাকহোল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই গাণিতিক বিশ্লেষণ থেকে একটি রোমাঞ্চকর সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। পৃথিবী থেকে মাত্র ২০ থেকে ২৫ আলোকবর্ষের দূরত্বের মধ্যেই হয়তো কোনো অদৃশ্য কৃষ্ণগহ্বর লুকিয়ে আছে। যদিও এত দূর থেকে এটি আমাদের সৌরজগতের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম নয়, তবু এই দূরত্ব মানুষের একটি জীবনের সময়কালের মধ্যে একটি মহাকাশযান পাঠানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। অবশ্যই তার আগে সেই লুকায়িত বস্তুটিকে শনাক্ত করতে হবে। বাম্বির মতে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার সময় ব্ল্যাকহোলটি যখন গ্যাস শোষণ শুরু করবে, তখন নির্গত বিকিরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা এটিকে খুঁজে পেতে পারি।
গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গবেষকরা প্রচলিত রকেট প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। রকেট বিজ্ঞানের একটি মৌলিক সমস্যা হলো রকেট সমীকরণের স্বৈরতন্ত্র—জ্বালানি নিজেকেই বহন করতে হয় বলে জ্বালানি বৃদ্ধি পেলে রকেটের মোট ভরও বাড়ে, যা আরও বেশি জ্বালানির প্রয়োজন তৈরি করে। এই চক্রের ফলে প্রচলিত রকেটে কয়েক আলোকবর্ষ দূরের কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে হাজার হাজার বছর লেগে যেতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে লেজারচালিত সৌর পাল বা সোলার সেইল। যেহেতু লেজারের ধাক্কায় খুব বেশি বল প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, তাই যানটির নকশা হতে হবে অবিশ্বাস্যভাবে হালকা। এর কেন্দ্রীয় অংশটি হবে মাত্র এক গ্রাম ওজনের একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপ, যার ভেতরেই থাকবে নেভিগেশন ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক সেন্সর এবং পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ট্রান্সমিটার। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে ১০ বর্গমিটার আয়তনের একটি ডাইইলেকট্রিক মেটাম্যাটেরিয়াল দিয়ে নির্মিত পাতলা পাল। পৃথিবী থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী লেজার রশ্মি ছুড়ে ওই পালে আঘাত করা হবে এবং হিসাব অনুযায়ী, এই শক্তির প্রভাবে যানটি মাত্র ১৭ মিনিটের মধ্যে আলোর বেগের এক-তৃতীয়াংশ গতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
এই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চললেও ২৫ আলোকবর্ষ দূরের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে যানটির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর সময় লাগবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যানটির গতি কমানোর কোনো ব্যবস্থা থাকবে না। ফলে প্রোবটিকে কৃষ্ণগহ্বরের অত্যন্ত কাছ দিয়ে তীব্র বেগে অতিক্রম করার সেই ক্ষণিক সময়ের মধ্যেই সব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পরবর্তীতে সেই ডেটা পৃথিবীতে পাঠাতে আরও ২০ থেকে ২৫ বছর সময় লাগবে। সব মিলিয়ে এই মিশনের মোট মেয়াদ হবে ৮০ থেকে ১০০ বছর। অর্থাৎ, যারা এই প্রকল্প শুরু করবেন, তাঁদের জীবদ্দশায় সম্ভবত ফলাফল দেখার সুযোগ হবে না।
তবে বাস্তবতার কথা বিবেচনায় আনলে বলতে হয়, এমন একটি মিশন সফল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বর্তমানে আমাদের হাতে নেই। কয়েক দশক ধরে আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যতায় টিকে থেকে ২০ আলোকবর্ষ দূর থেকে নিখুঁত বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রেরণ করতে সক্ষম এমন এক গ্রাম ওজনের চিপ তৈরি করা বর্তমান প্রকৌশলবিদ্যার ক্ষমতার অনেক বাইরে। তাছাড়া এত বিপুল শক্তির লেজার ব্যবস্থাও এখনো আমাদের নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিশানা করার মতো কোনো ব্ল্যাকহোলই এখনো আমাদের জানা নেই। এমনকি এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল প্রকল্প Breakthrough Starshot ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বন্ধ হয়ে গেছে।
তবুও তাত্ত্বিক দিক থেকে এই বাধাগুলোর কোনোটিই একেবারে অলঙ্ঘনীয় নয়। শুধু আরও উন্নত প্রকৌশলবিদ্যার প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান, যন্ত্রপাতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করতে শুরু করেছেন। ২০২৭ সালের গ্রীষ্মে এ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও রয়েছে। হয়তো সেই দিনই একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা হাতে আসবে না, কিন্তু প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ আমাদের কৃষ্ণগহ্বরে মিশন পাঠানোর স্বপ্নের দিকে এক ধাপ করে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সূত্র: ইউনিভার্স টুডে, ব্ল্যাকহোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স




