পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাওয়ালাকোট এলাকায় শিক্ষা বিভাগের কর্মী নাকাশ জারদাদ নিজের মহিষের খামারে অবস্থানকালে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের মাঝে পড়েন। পথ অবরুদ্ধ থাকায় বাড়ি ফিরতে না পারা এই তরুণের দেহে লক্ষ্যভ্রষ্ট একটি গুলি বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। চাচা আলতাফ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। জারদাদ ওই অঞ্চলের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় নিহত ৪০ জনের একজন।
নিহতদের মধ্যে ৩৪ জন বিক্ষোভকারী এবং বাকি ছয়জন পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)-র ডাকা লংমার্চ ও বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলছেন সমালোচকরা। কয়েক দশক পূর্বে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য স্থানীয় আইনসভায় বরাদ্দ ১২টি আসন বাতিলের দাবিই আন্দোলনের মূল কারণ। সরকারের তরফে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসিকে নিষিদ্ধ করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হয়। তবে জেএএসি স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ তাদের অভিপ্রায় নয়।
আইনসভার মোট ৫৩টি আসনের মধ্যে ৩৩টিতে সরাসরি ভোট হয়, আর ১২টি আসন সংরক্ষিত রেখে দেওয়া হয়েছে বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরিদের জন্য। বাকি আটটি আসন নারী ও অন্যান্যদের জন্য সংরক্ষিত। ১৯৭০-এর দশকে শুরু হওয়া এই নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল, ভূখণ্ডের শাসনব্যবস্থায় আশ্রিতদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, কিন্তু বর্তমানে এই আসনগুলোর সুবিধাভোগীদের বেশির ভাগই আর স্থানীয়ভাবে বসবাস করছেন না। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা চাইলেও ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না, যা জেএসির মতে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ণ করছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষ এই সংরক্ষণকে অপরিহার্য বলে তিন ধাপে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে।
আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদে বিরাজ করছে ভয় ও উত্তেজনার স্পষ্ট পরিবেশ। অধিকাংশ মানুষই নির্বাচন সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একজন প্রার্থীর পক্ষে কথা বললে জেএএসির কাছ থেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা পাওয়ার শঙ্কা কারও মধ্যে, তো অন্যদের মধ্যে রয়েছে জেএএসিকে সমর্থন দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানির ভয়। সহিংসতার ঘটনাত্তান্ত্রীদের গাড়ি ও সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো প্রার্থীকে হামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রচার-প্রচারণা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ঘরোয়া বৈঠক ও রাস্তার মোড়ে। ক্ষমতাসীন দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) একমাত্র নারী প্রার্থী নরিন আরিফ জানান, জনসমাবেশের পরিবর্তে তিনি বাসাবাড়িতে গিয়ে প্রচারে অভিযোজিত হয়েছেন।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা সরদার মুখতার খানের বয়ান অনুযায়ী, তরুণদের মধাআন্দোলনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় তারাও ‘সীমিত পরিসরে প্রচার’ চালাতে বাধ্য হয়েছেন। প্রচারসাপ্তাহের শেষে পিপিপি ও পিএমএল-এনের শীর্ষ নেতারা সমাবেশ করলেও, থমথমে এই আবহকে পাশ কাটিয়ে ভোট আয়োজনকেই ‘একমাত্র সমাধান’ হিসেবে বিবেচনা করছেন কাশ্মীরবিষয়ক মন্ত্রী আয়র মুকাম। তবে মুজাফফরাবাদ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন প্রধান জাহিদ আমিন মনে করেন, পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলেও তার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।
এদিকে, এই সহিংসতা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ উসকে দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার টুর্ক নিহত বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি জেএএসি-র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, নাগরিক সমাজের একটি সংগঠনকে অপরাধী চিহ্নিত করে ও সমাবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত এই সংঘাতকে ‘কয়েক দশকের কাঠামোগত শোষণ’ আখ্যা দিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধান দুই বিরোধী দলীয় নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো ভারতের বিবৃতি নাকচ করিয়ে পরিস্থিতির সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান এবং একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন, পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে শাস্তি প্রদান থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন।




