নেত্রকোনা সদর উপজেলায় ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় পুলিশের কাছে মামলা না করে স্থানীয় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে একটি সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ওই সালিশে রিপন মিয়াকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সালিশের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত শনিবার রাত প্রায় আটটার দিকে রিপন মিয়া ওই কিশোরীর বাড়িতে যান। ওই সময় মেয়েটি উঠোনে রান্না করছিল, তার বাবা স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানে এবং মা বাইরে কাজে ছিলেন। এই সুযোগে রিপন মিয়া তাকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন মিয়া সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ধর্ষণের অভিযোগ স্বীকার করে মাফ চাওয়ার জন্য স্থানীয় বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেছেন।

ওই কিশোরীর পরিবারের দাবি, রিপন মিয়া ভিডিও বানানোর কথা বলে আগে থেকেই মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করতেন। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারটি প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেনি। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে গত সোমবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারে অবস্থিত বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে সালিশ বসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র জানিয়েছেন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রিপন মিয়া অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং পরে তাকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা ও এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সালিশের একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, রিপন মিয়া অভিযোগ স্বীকার করে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ভুল করলেও করছি, না করলেও করছি। আমি, আফনেরার লগে থাহন লাগবো...! ভুল তো মানুষ করেই, আমি একটা ভুল কইরাইলছি।’ কথার এক পর্যায়ে তিনি ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেন। এই ভিডিওগুলো নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই ধর্ষণের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিশে করাকে আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ ফেসবুকে লিখেছেন, এই ধরনের অভিযোগের বিচার পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমেই হওয়া উচিত এবং দলীয় কার্যালয়ে বসে ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার চেষ্টা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল, যা নিন্দনীয়।

এ বিষয়ে জানতে রিপন মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনা জানাজানি হওয়ায় তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। পেশায় কাঠমিস্ত্রি রিপন মিয়া ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুকে ভিডিও তৈরি করছেন। ‘হাই আই এম রিপন ভিডিও’ ও ‘আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব’—এসব সংলাপের ভিডিও দিয়ে তিনি পরিচিতি পান। ২০১৯ সালে ‘রিপন মিয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন, যার বর্তমানে ১৯ লাখ ফলোয়ার রয়েছে।

ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের। বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্যও নেই। পরে আমরা এলাকাবাসী মিলে সালিসে বসেছিলাম। তারপর বলেছি আইনি পদক্ষেপ নিতে। সালিসের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন পুলিশ এসেছে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’ নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। অভিযোগ দেওয়ার জন্য মেয়েটিকে পরিবারের সঙ্গে থানায় পাঠানো হয়েছে। সালিসে থাকা দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং অভিযুক্ত রিপনকে আটকের চেষ্টা চলছে।