দৈনন্দিন পরিকল্পনার জন্য অনেকেই আবহাওয়ার খবরের দিকে তাকান। সেখানে বৃষ্টি হবে কি হবে না, সে সম্পর্কে সরাসরি নিশ্চিত করে কিছু বলা হয় না। তার পরিবর্তে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা শতাংশের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এই হার দেখে অনেকের মনেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, ৩০ শতাংশ বৃষ্টির অর্থ হয় দিনের ৩০ ভাগ সময় ধরে বৃষ্টি হবে, অথবা নির্দিষ্ট এলাকার ৩০ শতাংশ স্থানজুড়ে বৃষ্টি পড়বে।

প্রকৃতপক্ষে, আবহাওয়া দপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা (Probability of Precipitation বা PoP) বলতে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অন্তত ০.০১ ইঞ্চি (০.২৫ মিলিমিটার) বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনাকে বোঝায়। অর্থাৎ, যদি পূর্বাভাসে ৩০ শতাংশ বৃষ্টির কথা বলা হয়, তাহলে এর মানে হলো ওই স্থানে ওই দিন ন্যূনতম ০.০১ ইঞ্চি বৃষ্টি জমা হওয়ার সম্ভাবনা ৩০ শতাংশ। উল্লেখ্য, এই পরিমাপ বৃষ্টির স্থায়িত্ব বা তীব্রতা নির্দেশ করে না। হতে পারে বিকেলে কিছুক্ষণের জন্য মুষলধারে বৃষ্টি হলো, কিংবা সারাদিন ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি লেগে থাকল।

এই পূর্বাভাসের মূল লক্ষ্য হলো জনগণকে আবহাওয়ার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা। সহজভাবে বললে, ৩০ শতাংশ সম্ভাবনার অর্থ হলো আপনি হয়তো বাইরে গিয়ে শুকনো অবস্থায় ফিরতে পারেন, আবার সম্পূর্ণ ভিজেও যেতে পারেন। তবে এই সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে ঝুঁকি নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আপনার নিজেরই নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম ১৯৬৫ সালে জাতীয়ভাবে এই সম্ভাব্যতাভিত্তিক শতাংশের পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করে। প্রাথমিক পর্যায়ে আবহাওয়ার মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়াবিদদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ধারণার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করা হতো। কিন্তু ১৯৭০-এর দশক থেকে গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত মডেলের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর এই পূর্বাভাসগুলোর নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে মার্কিন আবহাওয়া দপ্তর (এনডব্লিউএস) একটি সমন্বিত পদ্ধতি প্রয়োগ করে, যেখানে একইসঙ্গে ৩০টি ভিন্ন আবহাওয়া মডেল ব্যবহৃত হয়।

এই মডেলগুলো অনেকটা সমান্তরাল বাস্তবতার মতো আচরণ করে। প্রতিটি মডেলের গণনা একই প্রাথমিক আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে শুরু হলেও সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর ফলাফল ভিন্ন হয়ে যায়। কোনো কোনো মডেল বৃষ্টির ইঙ্গিত দেয়, আবার কোনোটি দেয় না। যখন পূর্বাভাসে ৩০ শতাংশ বৃষ্টির সম্ভাবনা বলা হয়, তখন এর অর্থ দাঁড়ায় যে ব্যবহৃত ৩০টি মডেলের মধ্যে কমপক্ষে ১০টি মডেলে বৃষ্টি বা শিলাবৃষ্টির দেখা মিলেছে।

আধুনিক এই মডেলগুলো আসলে জটিল গাণিতিক সমীকরণ সমাধানের যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। বর্তমান তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় আর্দ্রতা এবং বাতাসের গতিবেগের মতো নানাবিধ তথ্য ব্যবহার করে এগুলো গণনা পরিচালনা করে। পূর্বাভাসের জন্য প্রয়োজনীয় এই উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় কৃত্রিম উপগ্রহ, রাডার, ভূপৃষ্ঠের স্টেশন এবং বিশেষ আবহাওয়া বেলুনের সহায়তায়। বায়ুমণ্ডলের অভ্যন্তরীণ অবস্থার নিখুঁত চিত্র পাওয়ার জন্য আবহাওয়া দপ্তর প্রতিদিন দুবার করে এই বেলুনগুলো আকাশে উৎক্ষেপণ করে। আবহাওয়াবিদেরা ব্যাখ্যা করেন, বেলুন ও উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সরাসরি শক্তিশালী সার্ভারে প্রেরিত হয়। সেখানে কম্পিউটার মডেলগুলো পদার্থবিজ্ঞান ও ক্যালকুলাসের সূত্র প্রয়োগ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবহাওয়ার সুক্ষ্ম পূর্বাভাস নির্মাণ করে।

কোন মডেলটি সঠিক এবং কোনটি ভুল সে বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেন আবহাওয়াবিদ। বিশ্বব্যাপী পূর্বাভাস দেওয়ার কোনো একক বা নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। বিভিন্ন আবহাওয়াবিদ বিভিন্ন মডেল ব্যবহার করেন। তাই কোন মডেলের হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিলবে, তা নির্ধারণে তাদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত করতে পরিসংখ্যান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে ‘ক্যালিব্রেট’ বা সমন্বয় করা হয়। এর ফলে কম্পিউটার মডেলের তাত্ত্বিক হিসাব ও বাস্তব বায়ুমণ্ডলের মধ্যে কোনো গরমিল বা পক্ষপাত থাকলে তা দূর করা সম্ভবপর হয়।

পূর্বাভাসের নির্ভুলতা বাড়াতে এত কিছু করার পরও বায়ুমণ্ডলের চিরপরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণে আবহাওয়ার খবর প্রায়শই পরিবর্তিত হয়। তারপরও, ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বর্তমান মডেলগুলো আবহাওয়াবিদদের বেশ কয়েক দিন আগেই সঠিক আভাস দিতে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে আবহাওয়াবিদেরা তেমন দক্ষ নন এবং তাদের ভবিষ্যদ্বাণী প্রায়ই মেলে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাঁচ বা সাত দিন আগেও বৃষ্টির বিষয়ে সঠিক উত্তর দেওয়ার মতো উন্নত প্রযুক্তি এখন তাদের হাতে রয়েছে।