বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে প্রায়শই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর বিখ্যাত উক্তি 'ঈশ্বর পাশা খেলেন না' এবং নীলস বোরের সাথে ঐতিহাসিক বিতর্ক এই ধারণাকে জোরদার করেছে। তবে প্রকৃত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইনস্টাইন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শত্রু না হয়ে বরং এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ অনিশ্চয়তা নীতি প্রকাশ করেন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো কণার অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব। এটি চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনস্টাইন এই অনিশ্চয়তাকে প্রকৃতির সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে, প্রকৃতির নিজস্ব নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং যা আমরা পুরোপুরি বুঝতে না পারা কেবল আমাদের সীমাবদ্ধতা।

তবে আইনস্টাইন নিজেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের পথিকৃৎ ছিলেন। ১৯০৫ সালে তিনি ফটো-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা দিতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম ধারণা ব্যবহার করেন। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর এই অবদান প্রাচীন কোয়ান্টাম তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে হাইজেনবার্গ ও শ্রোডিঙ্গার প্রাচীন তত্ত্বটিকে পূর্ণাঙ্গ বলবিদ্যায় রূপান্তরিত করেন, যা আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিকস নামে পরিচিত।

এছাড়াও, আইনস্টাইন বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান ও বোস-আইনস্টাইন কন্ডেনসেট তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর পরিসংখ্যানকে তিনি সমর্থন ও সম্প্রসারণ করেন।

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর সহকর্মী বরিস পডলস্কি ও নাথান রোজেনের সাথে ইপিআর প্যারাডক্স উপস্থাপন করেন। এটি কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণার জন্ম দেয়। এই প্যারাডক্সে আইনস্টাইন দেখান যে, পরস্পর বিজড়িত দুটি কণার একটির অবস্থা জানলে অন্যটির অবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়, যা বিশেষ আপেক্ষিকতার আলোর গতির সীমা লঙ্ঘন করে বলে মনে হয়। কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষাগুলো কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্টের বাস্তবতা প্রমাণ করে।

বোর-আইনস্টাইন বিতর্কের প্রতিটি পর্বে বোর এবং তাঁর দল আইনস্টাইনের সমালোচনার উত্তর দেন। এই বিতর্ক কোয়ান্টাম মেকানিকসের ব্যাখ্যাকে আরও শাণিত করে। শন ক্যারলের মতো পদার্থবিদদের মতে, আইনস্টাইনের প্রশ্নগুলো এত গভীর ছিল যে সেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই কোয়ান্টাম ইনফরমেশন ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো শাখার বিকাশ ঘটে।

এমআইটির অধ্যাপক ডেভিড কাইজার বলেন, আইনস্টাইন কখনো কোয়ান্টাম মেকানিকস ভুল প্রমাণ করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তত্ত্বটিকে আরও পূর্ণাঙ্গ করতে। তাই তাঁকে শত্রু না বলে কঠোর সমালোচক বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। আইনস্টাইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থিওরি অব এভরিথিং নিয়ে কাজ করেছেন, যা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতাকে একীভূত করার প্রচেষ্টা।

সুতরাং, আইনস্টাইনের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার বিকাশে সহায়ক হয়েছিল, বাধা নয়। তাঁকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শত্রু বলাটা ভুল ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা।