পাতা ঝরার এই ঋতুতে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে গভীর এক ব্যাকুলতা ও অস্তিত্ববাদী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে কবিতায়। ‘তারা ঝরা রাতে’ শীর্ষক এই রচনায় মৃত্যু ও বিষাদ যখন পরস্পরকে স্পর্শ করে, ঠিক তখনই তা ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয় — এই ধারণাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

কবিতার শুরুতে ঝুলন্ত সাঁকোর ওপারে মরুভূমির উটের পাহাড়ের মতো অবস্থান নেওয়া প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর অনিশ্চিত পথের কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রেমিক জানে না কীভাবে সে সেখানে পৌঁছতে পারবে; শুধু এটুকুই জানে যে তার প্রিয়তমাই তার অন্তিম বিষের বাঁশি, তার প্রাণভোমরা এবং তার স্বপ্নভূমির গন্তব্য।

পৃথিবীতে নশ্বরতা একটি ধ্রুব সত্য — এই উপলব্ধি কবিতার পরবর্তী অংশে এসেছে। ‘বালুঘর’ বারবার ধুয়ে মুছে যায় মহাজাগতিক প্রক্রিয়ায়। তবুও মানুষ স্বপ্ন বুনতে ভুলে না, যদিও শিকড় ছিঁড়ে যায় এবং অকালপতন ঘটে। এখানে চুম্বনের চেয়েও বড় এক ‘শুশ্রূষা’র ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধকেই নির্দেশ করে।

অপরদিকে, দেহের ভঙ্গুরতা অত্যন্ত প্রতীকীভাবে চিত্রিত হয়েছে। একসময় ফুলে ঢাকা যে শান্ত শীতল শরীর, তা একদিন পোকার খাদ্য হবে। রক্ত-মাংস-হাড় ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যাওয়ার আগেই কবি আহ্বান জানাচ্ছেন কণ্টকাকীর্ণ পথ হাঁটার এবং প্রকৃত অর্থে ‘মাটির মানুষ’ হয়ে ওঠার। যে সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক — ‘তুমি আমার, আমি তোমার’ — তা বুকের সাথে বুক মিলিয়ে ভালোবাসার বীজ বুনে যাওয়ার মাধ্যমে চিরস্থায়ী করার তাগিদ অনুভূত হয়েছে।

সবশেষে, তারা ঝরার রাতে বিষাদ যখন মৃত্যুর মুখ ছুঁয়ে প্রেম হয়ে ওঠে, তখন বৃষ্টি পতনের ভেতর দিয়ে কবি ‘অতলান্ত জীবনের’ শব্দ শুনতে পান। অর্থাৎ ধ্বংস ও বিষাদের গহ্বরেও যে একটি গভীর জীবনধ্বনি বিদ্যমান, তা-ই যেন এই কবিতার কেন্দ্রীয় সুর। পুরো রচনাজুড়ে মৃত্যু, ক্ষয় ও প্রেম একই সুতোয় গাঁথা হয়েছে, যা পাঠককে অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।