শীতকালে বাংলাদেশে বিচরণ করা খয়রা কাস্তেচরা পাখির একটি স্থায়ী প্রজনন আবাস রংপুরের মীরবাগ এলাকায় খুঁজে পাওয়া গেছে। এপ্রিল মাসের শেষদিকে বিপুল সংখ্যক পাখি একত্রে আসার খবর পেয়ে পাখি পর্যবেক্ষকদের একটি দল সেখানে গেলে তারা কাস্তেচরাগুলোর গতিবিধি অনুসরণ করে একটি বাঁশঝাড়ের দিকে এগিয়ে যান। সেখানেই তাদের চোখে ধরা পড়ে অনেকগুলো বাসার সমাবেশ। বাসাগুলো বাড়ির আঙিনায়, ঘরের খুব কাছাকাছি এবং পেছনের দিকে থাকা বিভিন্ন গাছে তৈরি করা হয়েছে, যা স্থানীয় আবাসিক এলাকার সঙ্গে পাখিগুলোর এক অনন্য সহাবস্থানের চিত্র তৈরি করে।

অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ, প্রকৌশলী ফজলুল হক ও লেখক রানা মাসুদের সমন্বয়ে গঠিত রংপুরের একটি পর্যবেক্ষক দল পূর্বে ২০২৩ সালে জয়পুরহাটে এবং ২০২৫ সালে লালমনিরহাটে এই পাখির সন্ধান পেয়েছিলেন। জয়পুরহাটে পাখি আলোকচিত্রী আহনাফ আল সাদমানের সহায়তায় তাসেরা একটি আবাসিক এলাকার বাঁশঝাড়ে বাচ্চাসহ খয়রা কাস্তেচরার কলোনি প্রত্যক্ষ করেন। তবে তৎকালীন সময়ে প্রজনন মৌসুম শেষে পাখিগুলো উড়ে গিয়েছিল। চলতি বছর রংপুরে আবিষ্কৃত কলোনিটি স্থায়ী প্রজনন চিহ্ন বহন করায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পাখির কলোনি বিশেষজ্ঞ শিবলি সাদিক উল্লেখ করেন, “২০১১ সালে টাঙ্গুয়া হাওরে প্রথম তিনটি খয়রা কাস্তেচরা রের্কড করা হয়। খাবারের সহজলভ্যতা এবং পূর্বের আবাসে কোন না কোন প্রতিকূলতার কারণেই এরা বাংলাদেশের নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।” তবে পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে দেন যে, জলাভূমি, বন ও ঝোপাঝাড় দ্রুত উজাড় হয়ে যাওয়ায় দেশের বহু পাখিই নিরাপদ আশ্রয় হারাচ্ছে। খয়রা কাস্তেচরা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকারী হিসেবে দেখা গেলেও এদের প্রজনন কলোনি অত্যন্ত দুলভ।

কলোনি আবিষ্কারের সময় একটি উদ্বেগজনক ঘটনাও সামনে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায় যে, কিছু পাখি শিকারি সেখানে এসে উৎপাত করছিল। এলাকাবাসী তাৎক্ষণিকভাবে তাদের প্রতিরোধ কর। পর্যবেক্ষক দলও নিজদের যোগাযোগের নম্বর দিয়ে স্থানীয়দের অনুরোধ করেন, কোন ব্যক্তি পাখি শিকার করতে এলে যেন তাদের জানানো হয় এবং শিকারির ছবি তোলা হয়। পরবর্তীতে আর কোনো শিকারির আসার খবর পাওয়া যায়নি। গবেষকরা মনে করছেন, স্থানীয়দের এমন সচেতনতাই ও আবাসস্থল সংরক্ষণই নিশ্চিত করতে পারলে ভবিষ্যতেও এই দৃষ্টিনন্দন অতিথি পাখিরা বাংলাদেশে প্রজনন করতে থাকবে।

ধুসর রঙের লম্বা ও বাঁকানো ঠোঁট, চোখের চারপাশের সাদা অংশ, এবং মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত বিস্তৃত গাঢ় খয়েরি বর্ণের জন্য পাখিটি খুবই আকর্ষণীয়। রোদ পড়লে এদের পাখায় সবুজ রঙের মিশ্রণ চকচক করে ওঠে, এ কারণেই ইংরেজিতে এর নামের সঙ্গে ‘গ্লসি’ (Glossy) শব্দটি যুক্ত হয়েছে। এই ‘গ্লসি আইবিস’ নামেই পরিচিত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Plegadis falcinellus।