আনুমানিক ১৬ কোটি বছরেরও অধিক সময় ধরে পৃথিবীর বুকে আধিপত্য বিস্তার করেছিল ডাইনোসরেরা। নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নুৎপাত ও জলবায়ুর পরিবর্তনকে অতিক্রম করেই এত দীর্ঘকাল টিকে ছিল বিশালাকৃতির বিভিন্ন প্রজাতির এই প্রাণী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি মহাজাগতিক ঘটনার মাধ্যমে তাদের যুগের অবসান ঘটে। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর পূর্বে একটি বিশালাকার গ্রহণ পৃথিবীর বুকেআঘাত হানে, যার পরিণতিতেই ডাইনোসর প্রজাতি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, জলবায়ু এবং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রই পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীদের অনুমান অনুযায়ী, ওই আঘাতের ফলে যে বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়, তা থেকে নির্গত শক্তির পরিমাপ ছিল প্রায় ১০ কোটি মেগাটন টিএনটির সমতুল্য। এই শক্তির পরিমাণ হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমার সম্মিলিত শক্তির চেয়ে ১০০ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী। এত প্রবল আঘাতে শিলাস্তর তাৎক্ষণিকভাবে বাষ্পীভূত হয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই আছড়ে পড়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। বায়ুমণ্ডলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন টন ধূলিকণা ও সালফার আবদ্ধ হয়ে পড়ায় কয়েক মাস এমনকি বছরজুড়ে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে বিশ্বজুড়ে নেমে আসে ঘন অন্ধকার ও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ।
সমুদ্রে জমে থাকা সালফারের কারণে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ভিদ জগৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। খাদ্যের তীব্র সংকটে প্রথমে তৃণভোজী ডাইনোসর এবং পরবর্তীতে মাংসাশী ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটে। এই মহা বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু প্রাণী টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। আধুনিক যুগের পাখিগুলো আসলে সেই বেঁচে যাওয়া ডাইনোসরদেরই উত্তরসূরী। আকারে খুদ্র হওয়ায় তাদের খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা কম ছিল, ফলে তারা টিকে যায়। কিন্তু দৈত্যাকার সরীসৃপরা পরিবেশগত পরিবর্তন ও তীব্র খাদ্য সংকটের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় ক্যাটেসিয়াস যুগের সমাপ্তি ঘটে তাদের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে।
ডাইনোসর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পর স্তন্যপায়ী প্রাণীরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিশাল গ্রহণের আঘাতের পরবর্তী সময়েই নতুন এক বিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং মানবজাতির বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে ওঠে।




