দেশের সড়কপথে ভয়াবহ মৃত্যুর চিত্র উঠে এসেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে সারা দেশে মোট ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এই দুর্ঘটনাগুলোতে ৪৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৫৬১ জন। নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন নারী ও ৫৬ জন শিশু রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার। জুন মাসে একাই ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা মোট নিহতের প্রায় ৩১ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি তিনজন নিহতের মধ্যে একজনই মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, থ্রি-হুইলার যেমন ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানে মোট ১১২ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। এছাড়া বাসের যাত্রী হিসেবে মারা গেছেন ২৭ জন, এবং ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির আরোহী নিহত হয়েছেন ৩৭ জন। পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছেন ৯১ জন, আর বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৭ জন।
দুর্ঘটনার স্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক সড়কগুলোতেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, সংখ্যাটি ১৯৪টি। এরপরেই রয়েছে জাতীয় মহাসড়ক, যেখানে ১৫১টি দুর্ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়কে ৬৪টি এবং শহরের সড়কে ৫৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, ২০৬টি ঘটনাই ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এছাড়া ১০৯টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৯৭টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা এবং ৫৩টি দুর্ঘটনা অন্য যানবাহনের পেছনে আঘাত করার কারণে সংঘটিত হয়েছে।
সময়ভিত্তিক চিত্রে দেখা গেছে, সকালবেলাতেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যা মোট ঘটনার প্রায় ৩১ শতাংশ। এরপর দুপুর, রাত এবং বিকেলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিভাগভিত্তিক হিসেবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে নিহত হয়েছেন ১১৮ জন। অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে কম ১৯টি দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে নিহতের সংখ্যা ১৬ জন। রাজধানী ঢাকা শহরেই ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়েছেন।
সড়কপথের পাশাপাশি জুন মাসে ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২১টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৭ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এই ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনার জন্য কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। তাদের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এর জন্য দায়ী। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংস্থাটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ, দক্ষ চালক তৈরি এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ ১২ দফা সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনটি জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে।




