ইরান সম্প্রতি ইয়েমেনে তাদের হুথি মিত্রদের বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও পানিশোধনাগারসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেওয়ার পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে রয়োটার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র ও একটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, হুথিরা ইতিমধ্যে লোহিত সাগরে জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করেছে এবং হামলা শুরুর নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে। ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যরাই নির্ধারণ করবেন কখন বাব আল-মান্দেব বন্ধ করা হবে।
গত এপ্রিল মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলী আকবর ভেলায়াতি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ইংরেজি এক পোস্টে বলেছিলেন, 'প্রতিরোধ ফ্রন্টের একীভূত কমান্ড বাব আল-মান্দেবকে হরমুজের মতোই দেখে।' তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'যদি হোয়াইট হাউস তার বোকামি পুনরাবৃত্তি করার সাহস করে, তবে তারা শিগগিরই বুঝতে পারবে যে একটি মাত্র পদক্ষেপেই বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্যের প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে।' ভেলায়াতির এই মন্তব্য ইরানের তথাকথিত 'অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স' জোটের ইঙ্গিত বহন করে, যার মধ্যে ইয়েমেনের হুথি, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকের কাতায়েব হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সামরিক স্থাপনায় হামলার হুমকি আগেও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের খার্গ দ্বীপে হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে মার্চ মাসে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম এক সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছিল, বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে 'অস্থিরতা' সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, ইরান নিজে বাব আল-মান্দেবের তীরবর্তী না হলেও ইয়েমেন এই কৌশলগত প্রণালীর তীরে অবস্থিত এবং হুথিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় হুথিরা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজের বিরুদ্ধে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছিল। সম্প্রতি তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সানা বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ এনে সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। মার্কিন শক্তি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪১ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহন করা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী দিয়ে ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। বাব আল-মান্দেব এশিয়ায় তেল রপ্তানির একটি বিকল্প পথ। এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে আনা হয়, যা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব হয়ে যায়। ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালী অবরোধের কয়েক দিন আগে সৌদি আরব ঘোষণা করে যে তারা পাইপলাইনের পূর্ণ পাম্পিং ক্ষমতা যুদ্ধপূর্ব স্তরে (প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল) ফিরিয়ে এনেছে। পাইপলাইনটি আগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা এখনো বাব আল-মান্দেবে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা না চালালেও তারা গাজা যুদ্ধের সময় যেমন লোহিত সাগরে অভিযান চালিয়েছিল, তেমনই আবারও জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, সুয়েজ খাল পেরিয়ে এশিয়ার দিকে যাওয়ার পথে অবস্থিত এই প্রণালী দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২% পরিবহন হয়। হরমুজ প্রণালীর পর এটিই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ, যা বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লাগবে।


