প্রায় সাড়ে তিন দশক পরে জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া হবে এবং ১৮ আগস্ট মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। এরপরও যদি একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকেন, তাহলে ২০ আগস্ট সংসদকক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কারণে বিএনপির প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত হলেও, বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ায় এবারের নির্বাচন ১৯৯১ সালের পর প্রথম ভোটাভুটির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সংসদকক্ষে সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয়েছিল। তখন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলটির স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাস। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, যাঁকে প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যা প্রয়োজনীয় ১৬৬ ভোটের চেয়ে মাত্র ছয়টি বেশি। অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। মোট ৩৩০ সদস্যের সংসদে ভোট পড়েছিল ২৬৪টি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে তখন রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ ছিল না। আবদুর রহমান বিশ্বাসের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা নিয়ে আওয়ামী লীগসহ কিছু দলের আপত্তি ছিল। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় রাজনীতিকের বদলে নিরপেক্ষ কাউকে বসানোর দাবিও ওঠে। আওয়ামী লীগ জানত, সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তাদের জয় কঠিন, তবে সাবেক প্রধান বিচারপতিকে প্রার্থী করে তারা দুইটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছিল। এছাড়া বিএনপির ভেতরে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে নিয়ে যাদের আপত্তি থাকতে পারে, তাদের ভোট টানারও কৌশল ছিল এটি।

সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েও নানা আলোচনা ছিল। সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ জামায়াতের ভোট পেতে তৎপর ছিল এবং তাদের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করেও ভোট চাওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে আবদুর রহমান বিশ্বাসও গোলাম আযমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এ নিয়ে দৈনিক সংবাদ ‘নিন্দনীয়’ শিরোনামে লেখাও ছেপেছিল। জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন করলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাদের সব সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে বলে আলোচনা রয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯৭২ সালে সংসদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। পরে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ভোটের ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান প্রথম প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, যেখানে তিনি প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পান। এরপর ১৯৮১ সালে বিচারপতি আবদুস সাত্তার ৬৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। ১৯৮৬ সালে এইচ এম এরশাদ ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে গেলে রাষ্ট্রপতি পদটি অনেকটা আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়ে, যদিও সংবিধানে তাকে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতিবারই একক প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। এবার অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে এবং তার পক্ষে মনোনয়নপত্র তোলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার সংসদ সদস্যরাই ভোটার। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তার দায়িত্ব পালন করবেন এবং সংসদকক্ষে প্রকাশ্যে ভোট গণনা হবে।